• সোমবার   ২৩ নভেম্বর ২০২০ ||

  • অগ্রাহায়ণ ৯ ১৪২৭

  • || ০৭ রবিউস সানি ১৪৪২

দৈনিক জামালপুর

আত্নহত্যা নাকি গ্যাসলাইটিং?

দৈনিক জামালপুর

প্রকাশিত: ৩০ অক্টোবর ২০২০  

আপনি নিজের অজান্তেই আপনার কাছের কাউকে কষ্ট দিয়ে ফেলেছেন এবং ক্ষমাও চেয়েছেন। কিন্তু এমন হলো যে সে  আপনাকে ক্রমাগত আপনার করা সে ভুল নিয়ে আপনাকে ব্লেম করতে থাকে, গিল্টি ফিল করাতে থাকে এবং সে এটা চালিয়ে যেতেই থাকে। এভাবে একটা সময় সে  আপনাকে এমন একটা পর্যায়ে নিয়ে আসে যে আপনার মনে হবে আপনি মানুষের কাতারেই পড়েন না। আপনি হতাশ হতে থাকেন এবং নিজের উপর সমস্ত বিশ্বাস হারিয়ে ফেলেন।

 

বাজার করে এসেছেন। হঠাৎই আপনার স্ত্রী চেঁচিয়ে বললো অমুক জিনিস কেনো আনেননি।  আপনি অবাক হয়ে গেলেন কারণ সে জিনিসটার কথা আপনাকে বলাই হয়নি। কিন্তু আপনার স্ত্রী এত বিশ্বাসযোগ্যভাবে আপনাকে বললেন যে আপনি ভাবতে শুরু করলেন আসলেই আপনি ভুলে গিয়েছিলেন।

 

আপনার কোন উইক পয়েন্ট আপনার কোন ফ্রেন্ড কোনভাবে জেনে গেলো। কিন্তু দেখা গেলো সে কারণে অকারণে আপনার সে দূর্বলতাকে ব্যবহার করে আপনাকে দমিয়ে রাখার চেষ্টা করছে, আপনাকে মানসিকভাবে ভেঙে দিচ্ছে।

 

''গ্যাসলাইটিং'' (Gaslighting)- শব্দটা শোনার সাথে সাথে আমাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে লাইটার দিয়ে আগুন ধরানোর চিত্র । কিন্তু মনোবিজ্ঞানের ভাষায় এই গ্যাসলাইটিং দিয়ে ভিন্ন কিছু বোঝায় ।

হলফ করে বলতে পারি যে, জীবনের কখনোই গ্যাসলাইটিং এর শিকার হননি এমন মানুষ পাওয়া যাবেনা। এতদিন হয়তো এই টার্মটার সাথে অনেকেই পরিচিত ছিলেন না কিন্তু এর শিকার বহুবার হয়ে এসেছেন। 

 

সংজ্ঞা না জানার কারণে একে সাধারণ আচরণ মনে করে গুরুত্ব দেননি কিন্তু আজকে থেকে ব্যাপারটা খুব ভালোভাবে উপলব্ধি করতে পারবেন এবং ''গ্যাসলাইটার'' দের থেকে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে চলতে পারবেন ।

 

গ্যাসলাইটিং বলতে এমন কোন আচরণকে বোঝায় যেখানে একজন মানুষ তার সঙ্গীকে অথবা পরিচিতজনকে ইচ্ছাকৃতভাবে খুব ছোট ছোট বিষয় নিয়ে কিংবা দুর্বলতা নিয়ে প্রচণ্ড মানসিক চাপে রাখে । 

 

উদাহরণস্বরূপ বলা যেতে পারে- আপনি বিপরীত লিঙ্গের কোন ক্লাস মেটের কাছ থেকে ক্লাসনোট নিতে গেছেন । সেখানে আপনার সঙ্গিও আপনার সাথে গেছে । ক্লাসনোট নেবার পর আপনার ক্লাসমেট আপনার দিকে তাকিয়ে একটু হেসে আপনার থেকে বিদায় নিলো ।

 

ঘটনা কেবল এততুকুই যার সম্পূর্ণটাই আপনার সঙ্গী নিজের চোখে দেখেছে এবং এখানে অপ্রীতিকর কিছুই ঘটেনি । কিন্তু রিক্সায় করে বাড়ি ফেরার সময় আপনার সঙ্গী আপনার ক্লাসমেটের বিদায় নেবার পূর্বে সেই হাসিকে কেন্দ্র করে আপনাদের দুজনকে নিয়ে উদ্ভট গল্প বানাতে শুরু করলো যার কিছুই আপনি করেননি কিংবা করেন না । এটাকে বলে গ্যাসলাইটিং ।

 

গ্যাসলাইটাররা এমন সব কর্মকাণ্ড করে যেখানে ভিকটিম তার নিজের মানসিকতা সম্পর্কে নিজেই সন্দিহান হয়ে ওঠে এবং নিজেকেই খারাপ ভাবতে শুরু করে । এসব কারণে গ্যাসলাইটারের মিথ্যা বক্তব্যের প্রতিবাদ করার মতও মানসিক অবস্থায় থাকেনা ।

 

শুধুমাত্র প্রেমের সম্পর্কের ক্ষেত্রেই এমনটা হবে তা নয় বরং যেকোনো সম্পর্কের মানুষই আপনার জীবনে গ্যাসলাইটার হয়ে আসতে পারে!

 

আপনি কারো দ্বারা গ্যাসলাইটিং এর শিকার হচ্ছেন কিনা সেটা বোঝার কিছু পদ্ধতি আছে । তার মধ্যে হরহামেশাই ঘটে এমন কয়েকটা তুলে ধরছি ।

 

১/ আপনার দুর্বল জায়গার দিকে ভিন্নভাবে আঙুল তুলবে । যেমন -আপনি আপনার দৈহিক ওজন নিয়ে বেশ বিব্রত থাকেন । সে হয়তো আপনাকে মোটা বলছেনা কিন্তু আশেপাশের তুলনামুলক চিকন মানুষদের দেখিয়ে তাদের দৈহিক গড়নের প্রশংসা করছে কিংবা সরাসরি আপনাকে অপমানজনক কথা বলছে । এটা গ্যাসলাইটিং ।

 

২/ সে বিভিন্নভাবে প্রমাণ করতে চেষ্টা করবে যে সে আপনার সম্পর্কে আপনার নিজের থেকেও ভালো জানে ।  আপনার সম্পর্কে বলা তার কোন কথায় যদি আপনি দ্বিমত পোষণ করেন তাহলে সে এমন আচরণ করবে যেন আপনি মিথ্যা বলছেন ।

 

৩/ সাধারণের চোখে অসঙ্গতিপূর্ণ কোন কিছুতে যদি আপনিও সবার মতই অবাক হন তাহলে সে এমন আচরণ করবে যেন এটা সবার কাছেই খুব সাধারণ শুধু আপনিই এটাকে খারাপভাবে নিলেন ।

 

৪/ আপনি খুব সাধারণ কিছু করলেন কিন্তু সে এমন আচরণ করবে যেন এটা আপনার রুচিকে নিম্নমানের হিসেবে সংজ্ঞায়িত করে। যেমন- আপনি এমন একটা পোশাক পড়লেন যেটা আপনার বেশ পছন্দের এবং সবাই আপনাকে এই পোশাকে বেশ পছন্দ করে । কিন্তু একজন গ্যাসলাইটার এমন আচরণ করবে যেন এই পোশাকে আপনাকে একদম মানায়নি এবং কোন শালীন মানুষ এই ধরণের পোশাক পড়তে পারেনা । এটা গ্যাসলাইটিং এর খুব পরিচিত একটি ধরণ ।

 

৫/ আপনার যেকোনো মতকে বিরোধিতা করতে করতে এমন পর্যায়ে নিয়ে যাবে যেখানে আপনি নিজেই দ্বিধায় পড়ে যাবেন ঘটনার সত্যতা নিয়ে যদিও ঘটনা আপনার নিজের চোখেই দেখা ।

 

৬/ এরা ঘনঘন ভুলে যাবার ভান করে । আপনাকে কোন কথা দিয়ে যদি সেটা রাখতে না পারে তাহলে এমন ভান করবে যেন সে আপনাকে কথাই দেয়নি কিংবা আপনি যেভাবে বলছেন পরিস্থিতি একেবারেই ভিন্ন ছিল ।

 

৭/ এরা আপনাকে মিথ্যা বলতে বাধ্য করবে । যেমন- আপনাকে জিজ্ঞেস করলো আপনি কার সাথে ফোনে কথা বলছিলেন ।  এর উত্তরে যদি আপনি বলেন যে বন্ধুর সাথে কথা বলছিলেন তাহলে সে যেই পরিমাণ বাজে আচরণ করবে সেটা আপনার মানসিক অবস্থার জন্য বেশ যন্ত্রণাদায়ক এবং এটা আপনি এড়াতে চান তাই আপনি বললেন মায়ের সাথে কথা বলছিলাম । গ্যাসলাইটার তার পূর্ববর্তী কর্মকাণ্ড দিয়ে আপনাকে এই মিথ্যাটা বলতে বাধ্য করলো ।

 

৮/ আপনি তার সাথে কোন কিছু শেয়ার করতে গেলে সে এমন কোন আচরণ করবে যার জন্য আপনি কোন কিছু শেয়ার করতে আর উৎসাহ পাবেন না ।  গ্যাসলাইটারদের সাথে থাকতে থাকতে পরবর্তীতে আপনার মধ্যে অন্য যে কারো সাথে আপনার অভিজ্ঞতা শেয়ার করার প্রবণতাও কমে আসবে এবং আপনি চরম হতাশ হয়ে পরবেন ধিরে ধিরে ।

 

৯/ তর্কে আপনি সঠিক হলেও গ্যাসলাইটার এমন আচরণ করবে যেন আপনি ভুল এবং তর্ক শেষে আপনাকেই তার কাছে ক্ষমা চাইতে বাধ্য করবে । একটা সময় আপনারও বারবার মনে হতে থাকবে যে সেই বোধহয় সঠিক আপনিই ভুল ।

 

১০/  সর্বোপরি আপনার মানসিক অশান্তির কারণ হবে এবং বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে আপনাকে চরম হতাশ এবং নৈরাশ্যবাদী মানুষে পরিণত করবে যা আপনি কখনোই ছিলেন না।

আমাদের সবার জীবনেই এই ধরনের গ্যাসলাইটাররা আছে।

 

এরা মূলত সাইকোপ্যাথ যারা সুপরিকল্পিত মিথ্যাচারের মাধ্যমে আপনার আত্নবিশ্বাস ধ্বসিয়ে দেয়। আপনার চোখেই আপনাকে জঘন্যরকম মানুষ ভাবতে বাধ্য করে।

 

মনোবিদদের মতে হঠাৎই কারো আত্নহননের পেছনে এদের ভূমিকাই সবচেয়ে বেশি কারণ এরাই আপনার বন্ধু,  আত্নীয়-স্বজন এবং কিছু ক্ষেত্রে বাবা-মা।

এদের এড়িয়ে চলুন।

 

Afsana Yesman Aurthi

Child physiologist and adolescent council

দৈনিক জামালপুর
দৈনিক জামালপুর