• বুধবার   ২৮ অক্টোবর ২০২০ ||

  • কার্তিক ১৩ ১৪২৭

  • || ১১ রবিউল আউয়াল ১৪৪২

দৈনিক জামালপুর

ধর্ষণ রোধে বাড়ানো দরকার ধর্মীয় অনুশাসন চর্চা

দৈনিক জামালপুর

প্রকাশিত: ৯ অক্টোবর ২০২০  

মাছির স্বভাব সে মিষ্টির পাত্রে বসবেই, এজন্যে মিষ্টি বিক্রেতাকে আবদ্ধ পাত্রে মিষ্টি রাখতে দেখেছি অভিজাত মিষ্টির দোকানে। স্বর্ণ নারীর অতীব পছন্দনীয় উপকরণ এবং নারীর সৌন্দর্য্য বর্ধনে সবার আগে স্বর্ণ চাই। খুব কম পরিমাণ স্বর্ণই হোক নারীজাতির কাছে অনেক তুষ্টির বস্তু। অার এ স্বর্ণ থাকে খুবই তদারকীতে এবং পুরো স্বর্ণের দোকানটি থাকে রাজকীয় অবয়বে। এগুলো একান্ত কিছু খ্যাদ্য ও সৌন্দর্য্য বর্ধনশীল বস্তুর কথা বলেছি মাত্র।

 

আমাদের নারীরা মশা-মাছি নয় বরং মিষ্টির মতোই আগলে রাখার মতো, মিষ্টি কিন্তু মাছি-মশার লোভনীয় বস্তু। নারী মুদির দোকানের নীচক কোন পণ্য নয় বরং স্বর্ণের দোকানের মুল্যবান স্বর্ণের চেয়েও অমূল্য রত্ন। নারীর অবস্থান কখন, কোথায়, কোন ভঙ্গিতে, কিভাবে হতে হবে তা নির্ধারণ করাটাও আমাদের সবার বিবেচ্য বিষয়। আপনি স্বীকার করুন বা নাই করুন, নারী লোভনীয়, মোহনীয়, নারী লক্ষি, নারী জঞ্জাল, নারী মমতার আধার, নারী উৎসাহ উদ্দীপনা, নারী সম্মান আর শ্রদ্ধার পাত্রও বটে। কে কিভাবে দেখছে তা ব্যক্তির একান্ত দৃষ্টিভঙ্গির উপর নির্ভর করছে। নির্ভর করছে সামাজিক মুল্যবোধের উপর। যেখানে নারীর এতগুলো গুণ আর মর্যাদা রয়েছে সেখানে নারীর চলাফেরার বিষয়টিও বিবেচ্য বিষয়।

 

আজকাল পত্রিকার পাতা খুললেই প্রথমে ধর্ষণের খবর নিয়ে শিরোনামটি চোখের সামনে ভেসে উঠে! খুবই আৎকে উঠি। বর্তমানে ধর্ষণ একটি নিয়মিত ঘটনায় রুপ নিয়েছে। ইতোমধ্যে দেশে আলোচিত বেশকয়েকটি ঘটনার মধ্যে ধর্ষণ একটি আলোচিত ঘটনায় জায়গা করে নিয়েছে। প্রতিদিন কোন না কোনভাবেই শিশু থেকে যুবতি এমনকি বয়োবৃদ্ধ মহিলাটিও ধর্ষিত হচ্ছে। প্রেমের কু-প্রস্তাবে যুবতিকে ধর্ষণ, গৃহবধুকে বিয়ের প্রলোভনে ধর্ষণ, জোর পূর্বক তরুণীকে ধর্ষণ, মা মেয়েকে একসাথে ধর্ষণ! শিক্ষার্থীকে তুলে নিয়ে ধর্ষণ। এভাবে অহরহ শিরোনাম মিডিয়া পাড়ায় প্রকাশিত হচ্ছে রোজ রোজ। সাথে সাথে মিডিয়া পাড়ায় ধর্ষণ ও ধর্ষকের বিরোদ্ধে মানববন্ধন, প্রতিবাদ সভা, ক্ষোভ, ঘৃণা প্রকাশের কথাও উঠে আসছে। এর পরেও ধর্ষণ বন্ধ হচ্ছেনা। এর পেছনের কারণটা কী আজো আমরা অনুধাবন করতে চেষ্টা করিনি।

 

একজন ধর্ষক একদিনেই ধর্ষক হয়ে উঠেনি। যাকে আমরা ধর্ষক বলে ঘৃণা জানাই সে ধর্ষণের আগেই আপাদমস্তক একজন মানব ছিলো। মানবের সুপ্ত বিবেক যখন বিলুপ্তি ঘটে তখন মিথস্ক্রিয়াশক্তির প্রভাবে সে হয়ে উঠে বেপরোয়া। এ জন্য দায়ী ব্যধিগ্রস্থ পরিবার, সমাজ ও রাস্ট্র ব্যবস্থা। মিষ্টির দোকানের মিষ্টিকে আবদ্ধ পাত্রে আগলিয়ে না রাখলে মাছি-মশা বসবে এটাই সত্য। আপনি যতই মৌলবাদ, যতই সুশীল, যতই হুজুর কিংবা সমাজের উন্নত স্তরের লোকই হোন না কেন নারী ফ্যাক্টর বিষয়ে আপনি দূর্বল শ্রেনি। ধর্ষণ আইন করে পুরোপুরি রোধ করা যাবেনা। একজন ধর্ষককে ফাঁসি বা মৃত্যুদন্ড দিলে সমূলেই ধর্ষণ সমাজ থেকে উঠে যাবেনা। এজন্যে ধর্ষণমুক্ত সমাজ বাস্তবায়ন করতে হলে আমাদের মুল্যবোধের জায়াগাটাকে প্রসারিত করতে হবে। ধর্মীয় বিধি বিধানকে মেনে চলতে হবে। নারীকে নারীর মতোই গড়ে উঠার পরিবেশ গড়ে তুলতে হবে।

 

আচ্ছা পরকীয়া করে প্রবাসীর স্ত্রী গাড়ী চালকের সাথে উধাও! দোষটা কার? প্রেমের কু-প্রস্তাবে তরুণীকে ধর্ষণ করে যুবক! দোষটা কার? স্কুল/কলেজ/মাদরাসা ছাত্রী বখাটে ছেলে কতৃক উত্যক্ত! দোষটা কার? 'এক হাতে কখনো তালি বাজেনা' কথাটি কেবলই বলি কিন্তু বাস্তবে মানিনা কেন? আমাদের মেয়েরা যখন অশালীন পোশাক পরিধান করে রাস্তাঘাতে দাপিয়ে বেড়ায়, চলতে পথে মেয়েরা অস্বভাবিক হাঁটাচলার ভঙ্গি দেখায়, মর্ডারণের দোহায় দিয়ে যখন শরীর টান টান পোশাক পরে, অতী সরল বিশ্বাসে যখন পরকীয়া করে, যখন যুবতী নারীর মুঠোফোন নম্বরটি অপরিচিত যুবকের কাছে চলে আসে, যখন আমাদের মেয়ে নিজের পরিবারের অগৌচরে পার্কে, রেস্তোরাঁয় অাধুনিকতার দোহায় দিয়ে অবাধ চলাফেরা করে তখন আমরা চোখে ঘনকালো চশমা পরিধান করি। পরে অনাখাংকিত ঘটনায় আমরা কেবলই পুরুষকেই দোষারোপ করি, কিন্তু কেন? মশা-মাছি আর মিষ্টির বিষয়টি এখানেই নীরেট সমাধান।

 

বাস্তবতায় আসি, আমার এক প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহপাঠী অর্পনা বড়ুয়া (ছদ্মনাম)। আমার বেশকিছু বড়ুয়া বন্ধুর কাছে শুনেছি অর্পনা চট্টগ্রাম কলেজে পড়ে। সে নিয়মিত বোরকা আর এপ্রোন পড়ে কলেজে আসা যাওয়া করতো। বিষয়টি শুনে আমি রীতিমতো অবাক হয়েছি! হঠাৎ একদিন অর্পনাকে আমি উপজেলা সদরের মার্কেটে দেখি! কিরে অর্পনা অনেক দিন পরে তোকে দেখলাম। তুই নাকি কলেজে যেতে আসতে বোরকা পড়িছ আর পর্দা করিছ? অর্পনা সহজভাবেই বলে দিল হ্যাঁ বোরকা পড়েই কলেজে যাই। অথচ তুই ত বড়ুয়া। তখন অর্পনা বিস্তারিত যা বলল: 'আমি প্রথম প্রথম যখন কলেজে যাই তখন থেকে কিছু কিছু বখাটে ছেলে আমার পিছু নেয়, তারা আমার দিকে অস্বভাবিকভাবে থাকায়। অনেক সময় আমাকে নিয়ে বাজে মন্তব্য করে। পরে বিষয়টি আমি পরিবারকে বলে নিরাপত্তার কথা ভেবে বোরকা পরে কলেজে যাওয়ার কৌশল করি। বোরকা পরে কলেজে যাওয়ার সময় আর আসতে সময় কেউ আর আমাকে উক্তত্য করতে আসেনা, পথ আগলিয়ে খারাপ মন্তব্য করেনা। হয় তো অনেকে আমাকে সেকেলের ভেবে আমার দিকে থাকায় না। সে থেকে আমি অনেকটা নিরাপদ বোধ করে চলাফেরা করছি। তাছাড়া বোরকা পড়াতে আমার আরো একটি সুবিধা হলো রাস্তাঘাটের ধূলাবালীও আর নাসিকা যন্ত্র দিয়ে প্রবেশের আশংকা থাকেনা। বোরকাতেই আমি নিরাপদ বোধ করি ভাই।' মূলত এটি বলার জন্য কোন গল্প বলিনি বাস্তব একটা ঘটনার সাক্ষি আমি ও আমার সহপাঠি ও ছদ্মনামীয় অর্পনা বড়ুয়ার কথাই বলেছি মাত্র। এখানে বোরকাটি ধর্মীয় আচরণবিধি। নারীত্বের স্বকীয়তার, ইজ্জত আবরুর রক্ষা করার মতো একটি পদ্ধতির অনুসরণ মাত্র।

 

তাই আমাদের ছেলে মেয়েদেরকে আদর্শ শিক্ষায় শিক্ষিত করে গড়ে তোলা জরুরী। মর্ডারণের দোহায় দিয়ে একসাথে মা বাবা, ভাই বোন হিন্দি সিরিয়াল দেখা থেকে বিরত থাকুন। পরিবারকে ধর্মীয় শিক্ষার আদলে গড়ে তুলেন। আমাদের আচরণ বিধি, পোশাক পরিচ্ছদে ধর্মীয় আদর্শকে গুরুত্ব দিই। নারী স্বাধীনতার নামে নারীকে নারীত্ব বিকিয়ে দিয়ে অবাধ চলাফেরাকে নিয়ন্ত্রণ করি। যুবক ছেলে মেয়েদের কে উপযুক্ত সময়ে বিয়ে দেওয়ার জন্য পরিবার, সমাজকে উৎসাহিত করি। বিয়ের কাবিন নামে মোটা দাগের দরকষাকষিকে আভিজাত্য বলা থেকে বিরত থাকি। যৌতুকমুক্ত সমাজ গড়তে সচেতনতা গড়ে তুলি। সভ্য সমাজে অতি উচ্চমাত্রায় কাবিন আর যৌতুক প্রথা সমাজকে যেনা ব্যভিচারের দিকে আহ্বান করে। ধর্ষণ রোধে অবাধ ও অশালীন দর্শনকে সবার আগে রোধ করি।

 

যুব সমাজকে কলুষিত করার উপকরণ- মদ, জোয়া, ইয়াবার বিরুদ্ধে কঠোর আইনের বাস্তবায়ন হোক। কিশোর গ্যাং প্রতিরোধে প্রশাসনের কঠোর অবস্থান গড়ে উঠুক। বেকারত্ব দূরীকরণে সরকারী বেসরকারী কর্মসৃজনের উদ্যোগ গ্রহণ করা হোক। শিক্ষা ব্যবস্থায় ধর্মীয় শিক্ষাকে অধিকতর গুরুত্ব দেওয়া হোক। একটি সুন্দর, আদর্শ সমাজ বিনির্মানে ধর্মীয় মূল্যবোধের কোন বিকল্প নাই। অশ্লীলতাকে আধুনিকতার দোহায় দিয়ে অভিজাত্য প্রকাশ করা থেকে বিরত হলেই সকল অশুভ কর্মকান্ড পরিবার, সমাজ, রাস্ট্র থেকে বিলুপ্ত হবে। তবেই, ধর্ষণ আর ধর্ষক, ধর্ষিতা নামের অধ্যায়টির ইতি ঘটবে।  অন্যতায় আইন আইনের গতিতে চলবে, ধর্ষণ ধর্ষণের গতিতে চলবে।

 

লেখক:

শিব্বির আহমদ রানা

শিক্ষক ও সাংবাদিক

দৈনিক জামালপুর
দৈনিক জামালপুর