বৃহস্পতিবার   ২৩ জানুয়ারি ২০২০   মাঘ ৯ ১৪২৬   ২৭ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪১

দৈনিক জামালপুর
১১৮

বই পরিচিতি: যেমন ছিলেন তিনি

প্রকাশিত: ১৭ ডিসেম্বর ২০১৯  

বইঃ যেমন ছিলেন তিনি

মূলবইঃ كيف عاملهم (কাইফা আ'মালাহুম)

লেখকঃ শাইখ মুহাম্মাদ সালিহ আল-মুনাজ্জিদ

অনুবাদঃ আব্দুল্লাহ ইউসুফ

সম্পাদনাঃ তারেকুজ্জামান তারেক।

প্রকাশনীঃ রুহামা পাবলিকেশন

পৃষ্ঠাঃ ১১৬২

মূল্যঃ ১০০০ টাকা (মুদ্রিত মূল্য ১৩৪০ টাকা)

 

প্রারম্ভিকা:

পবিত্র কোরআনুল কারীমে একজন মহামানবের ব্যাপারে বর্ণিত হয়েছে-'নিশ্চয় আপনি সর্বোত্তম চরিত্রের উপর অধিষ্ঠিত'। আয়িশা রা. এর কাছে সেই মহামানবের চরিত্র সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন- 'কোরআনই তাঁর চরিত্র।’ পাঠক, কি ভাবছেন? কেমন ছিলো এই মহামানবের চরিত্র-মাধুরী? মানুষের সাথে কথা বলার ক্ষেত্রে তাঁর মুখের ভাষা কেমন মধুর ছিলো? মানুষের হৃদয়ের গহীনে কতোটা ভালোবাসার জায়গা ছিল তার জন্য? 

 

পাঠক, জানেন! সেই মহামানবকে যে ধরনের লোকেরাই দেখতো, অকপটে স্বীকার করতো- 'আমি তাঁর চেয়ে উত্তম কোন মানুষকে দেখিনি। আমি মুহাম্মাদ থেকে উত্তম চরিত্রের অধিকারী কাউকে দেখিনি'। সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম।

.

প্রিভিউ:

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে জীবনের চেয়ে বেশী ভালোবাসার মাঝে আমাদের দুনিয়ার জীবনের সফলতা নিহীত। তাঁকে যে যতো বেশী ভালোবাসবে, তাঁর সাথে হৃদয়ের সম্পর্ক যতো বেশী গভীর করতে পারবে, সে ততো সফলকাম হবে। এই জন্য রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজেই বলেছেন—‘তোমাদের কেউ আমাকে তার সবকিছু থেকে বেশী ভালো না বাসলে প্রকৃত মুমিন হতে পারবে না'। আর ইমানের পরিপূর্ণতা যার যতো বেশী সে ততো সফলকাম। তাই সফলতা পেতে হলে নবিজিকে ভালোবাসতে হবে।

 

আচ্ছা!পৃথিবীতে কি এমন কোন প্রেমিক আছে, যে তার ভালোবাসার মানুষকে গভীরভাবে উপলব্ধি রাখে না? এমন কোনো প্রেমিক কি আছে যে তার ভালোবাসার মানুষের কথাবার্তা, চরিত্রমাধুর্য, খাওয়া-দাওয়া, ভালোলাগা সম্পর্কে সম্যক জ্ঞান রাখে না? কে সেই হতভাগা প্রেমিক যে তার প্রিয়জনের ব্যাপারে উদাসীন, অসচেতন?! তাঁর জীবনকাল সম্পর্কে অজ্ঞ! 

কে সেই ব্যর্থ মানুষটি?

কে? 

আপনি-আমি নই তো? 

এই হতভাগা প্রেমিকদের জন্য রুহামার এবারের আয়োজন 'যেমন ছিলেন তিনি'। যা পড়ে আপনি আপনার ভালোবাসার প্রিয় মানুষ রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সম্পর্কে জানতে পারবেন। জানতে পারবেন তাঁর ভালোলাগা সম্পর্কে। জানতে পারবেন তাঁর আদেশ-নিষেধ সম্পর্কে। সর্বোপরি জানতে পারবেন মানবতার সর্বোত্তম আদর্শের জীবনযাপনের নানান পদ্ধতি সম্পর্কে।

.

বইয়ের সাজসজ্জা:

মূল বইয়ের নাম 'কাইফা আমালাহুম'। অনূদিত গ্রন্থের নাম দেওয়া হয়েছে 'যেমন ছিলেন তিনি'। মূল বইটিকে দুই খন্ডে ছয়টি অধ্যায়ে মোট ২৫ টি পরিচ্ছেদে সাজানো হয়েছে। প্রথম খন্ডে সন্নিবেশিত হয়েছে ৩টি অধ্যায়—

 

➤প্রথম অধ্যায় - জগৎবাসীর আদর্শ।

➤দ্বিতীয় অধ্যায় - পরিবার, আত্মীয় ও প্রতিবেশীদের সাথে রাসুলের আচরণবিধি।

➤তৃতীয় অধ্যায় - সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষের সঙ্গে রাসুলের আচরণবিধি।

দ্বিতীয় খন্ডে রয়েছে বাকি ৩টি অধ্যায়-

➤চতুর্থ অধ্যায় - দাওয়াতের আওতাভুক্ত বিশেষ বিশেষ শ্রেণির সঙ্গে রাসুলের আচরণবিধি।

➤পঞ্চম অধ্যায় - সমাজের সর্বস্তরের মানুষের সঙ্গে রাসুলের আচরণবিধি।

➤ষষ্ঠ অধ্যায় - মানুষ-ভিন্ন অন্যান্ন সৃষ্টির সঙ্গে রাসুলের আচরণবিধি।

 

প্রথম অধ্যায়ে রয়েছে দুটি পরিচ্ছেদ। এতে আলোচনা করা হয়েছে আদর্শের ব্যাখ্যা ও ব্যাপ্তি নিয়ে। রাসুলের অনুপম জীবন আদর্শ এবং তাঁকে অনুসরণের বিভিন্ন দিক সম্পর্কে। এতে দেখানো হয়েছে ইবাদত, আমাল, ধৈর্য-সহিষ্ণুতা, দাওয়াত ইত্যাদি ক্ষেত্রে রাসুল হলেন সর্বোত্তম আদর্শ।

 

দ্বিতীয় অধ্যায়ে রয়েছে আটটি পরিচ্ছেদ। এতে আলোচনা করা হয়েছে পরিবার -স্ত্রী, সন্তান-সন্ততি-, আত্মীয় এবং প্রতিবেশী ও মেহমানের সাথে রাসুলের আচরণ সম্পর্কে। এ অধ্যায়ে দাসদাসী, চাকরবাকর সাথে তিনি কেমন ছিলেন, এ বিষয়েও আলোকপাত করা হয়েছে। এ অধ্যায়ে এসেছে পরিবারের সাথে তাঁর কোমলতা, প্রতিবেশীদের সাথে হৃদয় জুড়ানো আচরণের চিত্রায়ণ।

 

তৃতীয় অধ্যায়ে রয়েছে আটটি পরিচ্ছেদ। এতে আলোচনা করা হয়েছে সমাজের তূলনামূলক অনগ্রসর শ্রেণি—প্রতিবন্ধী ও বিপদগ্রস্তদের সাথে রাসুলের আচরণ। এতে আরো আলোচনা করা হয়েছে ধনী-গরিব, মেধাবী বা ঝগড়াটে মানুষদের সাথে রাসুলের মেলামেশা, আচরণ সম্পর্কে।

 

চতুর্থ অধ্যায়ে রয়েছে পাঁচটি পরিচ্ছেদ। দাওয়াতের আওতাভুক্ত বিশেষ শ্রেণির সাথে রাসুলের আচরণ সম্পর্কে এ অধ্যায়ে আলোচনা করা হয়েছে। নওমুসলিম, উৎসুক, অনুসন্ধিৎসু, বেদুইন, মুনাফিক ইত্যাদি শ্রেণির সাথে রাসুল কেমন আচরণ করতেন, তাদের সাথে কীভাবে কথাবার্তা বলতেন এতদ সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে।

 

পঞ্চম অধ্যায়ে রয়েছে তিনটি পরিচ্ছেদ। এতে আলোচনা করা হয়েছে সমাজের সর্বস্তরের মানুষদের সাথে রাসুলের আচরণ সম্পর্কে। সাধারণ নারী, বয়স্কদের সাথে রাসুলের আচরণ কেমন ছিলো এ সম্পর্কে সবিস্তার আলোচনা হয়েছে এ অধ্যায়ের পরিচ্ছেদগুলোতে।

 

ষষ্ঠ অধ্যায়ে রয়েছে দুটি পরিচ্ছেদ। এ অধ্যায়ের বিষয়বস্তু হচ্ছে, রাসুলের জীবদ্দশায় মানুষভিন্ন অন্যান্য প্রাণির সাথে যেমন জিন জাতি,পশুপাখির সাথে রাসুলের আচরণ।

 

বইয়ের ধরণ:

রাসুলের জীবনচরিত কে পরিভাষায় সিরাত বলা হয়। যাতে তার জীবনের সব দিক নিয়ে -সমসাময়িক পরিস্থিতি, ঘটনার ধারাবাহিকতা রক্ষা, আরবের তৎকালীন অবস্থা ইত্যাদি সবিস্তারে উল্লেখ করা হয়। সে হিসেবে বইটিকে পারিভাষিক অর্থে সিরাতের বই বলা যাবে না।

 

আবার যদি বলি শামায়েল? নাহ। তাও বলা যাবে না। কারণ শামায়েল বলা হয় যাতে রাসুলের গঠন-আকৃতি, দেহাবয়ব প্রভৃতি নিয়ে আলোচনাকৃত বইকে। এ অর্থে বইটিকে শামায়েলও বলা যায় না। তাহলে কি ধরনের বই এটা? 

 

মূলত এই বইয়ে লেখক বিশুদ্ধ হাদীসের ভাণ্ডার চষে বর্ণনার ধারাবাহিকতায় সুন্নাহ তথা রাসুলের জীবনের নানা দিক তুলে ধরেছেন। সংকলন করেছেন ভিন্ন ধারার এক সিরাত-গ্রন্থ। সম্পাদকের ভাষায় -'সবচেয়ে ভালো হবে এটিকে সুন্নাহ সংকলন বললে'।

 

বৈশিষ্ট্যসমূহ:

 

-বইয়ের সবগুলো বিষয়ে বিশুদ্ধ হাদিসের রেফারেন্সে উল্লেখকরণ। যা অনুসন্ধিৎসু পাঠকের তৃষ্ণা নিবারণ করবে।

-পরিচ্ছেদ-সমূহের সুন্দর বিন্যাস। প্রতিটা অধ্যায়ের আওতায় পরিচ্ছেদে ভাগ করে আলোচনা করা হয়েছে, যা পাঠকের জন্য সুখপাঠ্য হবে।

-হাদিসের তাখরিজ পাদটীকায় উল্লেখকরণ।

- সাবলীল অনুবাদ। পাঠক পড়া মাত্রই উপলব্ধি করবেন, অনুবাদে যথেষ্ট প্রাণ আছে। যারফলে দীর্ঘসময় একাধারে বইটি পড়া হলে বিরক্ত বা একঘেয়েমি আসবে না।

- নির্ভরযোগ্য ব্যাখ্যাগ্রন্থ (শরাহ) থেকে প্রয়োজনীয় ব্যাখ্যা সংযোজন।

-বিভিন্ন স্থানে উলামায়ে সালাফ, উলামায়ে হক্কানির উক্তি উল্লেখকরণ। যা বইটির সমৃদ্ধি বৃদ্ধি করেছে।

---

 

বইটি কেন পড়বেন?

➤ আয়িশা রাঃ এর উক্তি -"كان خلقه القرآن ( অর্থাৎ - কুরআনই ছিলো তাঁর চরিত্র )"এর প্রায়োগিক রূপ জানতে হলে এ বইটি অবশ্যপাঠ্য।

➤ রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জীবনে রয়েছে আমাদের জন্য উত্তম আদর্শ। তাঁর আদর্শ আমাদের জানতে হবে। তাই 'যেমন ছিলেন তিনি' পড়তে হবে।

➤ রাসুলকে যে যতো অনুসরণ করবে সে ততো সফলকাম হবে। অনুসরণ করতে হলে জানতে হবে, বুঝতে হবে।

➤ ফিতনার অন্ধকারে ডুবন্ত এ সময়ে অমুসলিমরা রাসুলের আদর্শে অনৈতিকভাবে কালিমা লেপন করার জোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। সেই সাথে পশ্চিমা নতুন নতুন ফ্যাশন বাজারজাত করছে। যা সম্পূর্ণ শরীয়াহ বিরোধী। এই চক্রান্তের ফাঁদে অনেক সাধারণ মুসলমান বিভ্রান্ত হচ্ছে প্রতিনিয়ত। তাদের কাছে রাসুলের জীবনচরিত, অনুপম আদর্শের বাণী পৌঁছে দেওয়ার জন্য ও বইটি পড়া উচিত।

➤ চৌদ্দশ বছর পূর্বে আরবের একজন-আপনার সুঃখ দুঃখ নিয়ে ভাবতেন আর বলতেন 'لو لا آن أشق على أمتي (যদি আমার উম্মতের জন্য কষ্টসাধ্য না হতো!) 

- মৃত্যুর সময়ও আপনার কল্যানের চিন্তা করে বলে গেলেন: "الصلاة الصلاة وما ملكت أيمانكم" (তোমরা সালাতের উপর বিশেষ লক্ষ রাখবে এবং অধীনস্থদের অধিকারের খেয়াল রাখবে।)

- হাশরের ময়দানেও যখন সবাই নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত থাকবে তখনো তিনি আপনার মুক্তির চিন্তায়, আপনার পরিণতি নিয়ে ভাববেন আর বলবেন أمتي أمتي (হায়! আমার উম্মতের কী হবে!)

যিনি আপনাকে না দেখেও আপনার জন্য এতোকিছু করলেন তাকে একটু জানা উচিত না? জানা উচিত না তার আচার-আচরণ সম্পর্কে?

পৃথিবীর সবচে' অসাধারণ হয়েও যিনি জীবনযাপন করেছেন সাধারণ হিসেবে, তার জীবনঘনিষ্ঠ কিছু ঘটনা কি শুনতে ইচ্ছে হয় না? ইচ্ছে হলে মেলে ধরুন 'যেমন ছিলেন তিনি'।

➤ ইবনুল ক্বায়্যিম যাওজিয়্যাহ রহিমাহুল্লাহ বলেন, 'দুনিয়া ও আখিরাতের সৌভাগ্য ও সাফল্যের অধিকারী হতে হলে নবিদের অনুসরণের বিকল্প নেই। তাদের কথা ও কর্মই ভালোমন্দ নির্ণয়ের মাপকাঠি। তাদের অনুসরণ ব্যাতীত আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের কোন উপায় নেই।

দৈনিক জামালপুর
দৈনিক জামালপুর