শনিবার   ১৬ নভেম্বর ২০১৯   অগ্রাহায়ণ ১ ১৪২৬   ১৮ রবিউল আউয়াল ১৪৪১

দৈনিক জামালপুর
৩১

মা ও দুই মেয়েকে ধর্ষণ করার পর রাজ্য থেকে বিতাড়িত

প্রকাশিত: ৩১ অক্টোবর ২০১৯  

বয়স যখন তার ১৮ তখনই বিয়ে হয় তার। এরপরেই দুই কন্যার জননী হন তিনি। সুখেই সংসার চলছিলো। তবে ভাগ্য তার সুখ কেড়ে নেয়। যদিও তিনি তখন কম বয়সী রাণী। বলছি, কেল্টিক আইসিনাই গোত্রের বিদ্রোহী রাণী বুডিকার কথা। তার বিয়ে হয় ব্রিটেনের রাজা প্রাসুটেগাসের সঙ্গে। স্বামী ও দুই কন্যা ইসোলডা ও সিয়োরারকে সঙ্গে নিয়ে তাদের সংসার ভালোই চলছিলো বুডিকার। তবে বাঁধ সাধলো রোমানরা।

 

৪৩ খ্রিস্টাব্দে ব্রিটেন দখল করে নেয় রোমানরা। বেশীরভাগ কেল্টিক গোত্রকে বাধ্য করা হয় আত্মসমর্পণ করতে। ছিনিয়ে নেয়া হয় তাদের সব ক্ষমতা ও অধিকার। তবে দু'জন কেল্টিক রাজাকে রোমানরা তাদের অঞ্চলে সীমিত ক্ষমতায় ঐতিহ্যগত শাসন বজায় রাখার সুযোগ দেন। রাজারা তাদের জীবনকাল পর্যন্ত ক্ষমতায় থাকার সুযোগ পান। 

 

নিয়ম অনুযায়ী, তাদের মৃত্যুর পর সে রাজত্ব রোমান শাসনের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার শর্ত দেয়া হয়। দু’জনের মধ্যে একজন কেল্টিক রাজা ছিলেন প্রাসুটেগাস। স্থানীয়দের উপর রোমানদের নিপীড়ন দিন দিন বাড়ছিলো। কেল্টিক ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিতে জোরপূর্বক হস্তক্ষেপের চেষ্টা, অস্বাভাবিক কর বৃদ্ধি করা ইত্যাদি জুলুমের ফলে মানুষ নির্যাতিত হচ্ছিলো। এবার তবে জেনে নিন এসবের মাঝে রাণী বুডিকার ভূমিকা কী ছিলো?

 

সমসাময়িক রোমান ইতিহাসবিদ ও রাজপরিবারের কর্মকতা ট্যাসিটাস (৫৭-১১৭ খ্রিস্টাব্দ) আর ক্যাসিয়াস ডিও(১৫৫-২৩৫ খ্রিস্টাব্দ)-এর বর্ণনা থেকে রানী বুডিকার প্রাথমিক জীবন সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। ইংল্যান্ডের প্রাচীন শহর কামুলোডানাম (বর্তমান কোলচেস্টার) এর এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে ৩০ খ্রিস্টাব্দে জন্ম হয় বুডিকার। ধারণা করা হয় কেল্টিক দেবীর নামানুসারে তার নামকরণ হয়েছিলো।

 

কিশোর বয়সেই বুডিকাকে কেল্টিক ইতিহাস, ঐতিহ্য ও রণকৌশল সম্পর্কে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। সেকালে কেল্টিক নারীরা যুদ্ধময়দান ও রাজ্য শাসনে সমানভাবে অংশগ্রহণ করতেন। ছেলেদের পাশাপাশি মেয়েদেরও সমান পারদর্শী করে গড়া হতো তলোয়ার ও অন্যান্য অস্ত্র চালনায়। স্বাধীনতা ও অধিকারচর্চায় তৎকালীন কেল্টিক নারীরা অনন্য আসনে বিরাজমান ছিলেন। গ্রিক, রোমান ও অন্যান্য প্রাচীন সমাজের তুলনায় তারা অনেক বেশী সুযোগ-সুবিধা ভোগ করতেন। এ তো গেলো রাণীর বেড়ে ওঠার গল্প। 

 

সুখের সংসারের মধ্যেই রাণীর জীবন মোড় নেয়। ৬০ খ্রিস্টাব্দে অতর্কিত পরিবর্তন আসে বুডিকার জীবনে রাজা প্রাসুটেগাসের মৃত্যুর ফলে। রাজা তার উইলে উত্তরসূরি হিসেবে স্ত্রী ও দুই কন্যার সঙ্গে রোমান সম্রাট নিরোকে রাজ্য পরিচালনার ভার দিয়েছিলেন। কিন্তু রোমান আইনে পুরুষ উত্তরাধিকারী ছাড়া ক্ষমতা লাভের নিয়ম ছিলো না। তাই রোমানরা জোর করে ক্ষমতা ছিনিয়ে নেয় রাজার উইল অগ্রাহ্য করে। জনসম্মুখে রাণী বুডিকাকে চাবুকপেটা করে আর দুই কন্যাকে রোমান সৈনিকরা ধর্ষণ করে। রাজার আত্মীয় স্বজন ও উচ্চপদস্থ কর্মকতাদের দাস বানিয়ে রাখা হয়।

 

অতঃপর রোমান রাজত্বের বিরুদ্ধে রানী বুডিকার বুকে জ্বলছিলো প্রতিশোধের আগুন। রাজ্য হারানোর শোক, নিজ সন্তান, জাতির উপর নির্যাতন ও বঞ্চনার বেদনা, ক্ষোভের অঙ্গার হয়ে উঠেছিলো বুডিকার হৃদয়ে। রাণী বুডিকা আইসিনাই, ট্রিনোভানটি, ডিউরোট্রিজেস, কোরনোভি ও অন্যান্য গোত্রের প্রধানের সঙ্গে দেখা করে জনবল সঞ্চয় করতে শুরু করেছিলেন। স্থানীয় এসব গোত্রের সবাই তখন নির্যাতিত, অবহেলিত। তাই রানীর আহ্বানে ব্যাপক সাড়া জাগে।

 

বুডিকা তার দুই কন্যাকে নিয়ে নিজস্ব রথে চড়ে সৈন্য সংগ্রহ ও সাধারণদের উজ্জীবিত করতেন। সাধারণের সঙ্গে তিনি মিশতেন সাধারণ হয়েই। সাবেক রাণী হয়ে হারানো সাম্রাজ্যের ক্ষতিপূরণের আশা না করে একজন নির্যাতিত মা ও সাধারণ মানুষ হিসেবে নিজের দুর্দশা তুলে ধরতেন মানুষের সামনে। রোমানদের বিরুদ্ধে জীবন পণ করে যুদ্ধে নামার প্রত্যয় ছড়িয়ে দেন সাধারণের মাঝে। 

 

তিনি মানুষকে বোঝান অন্যায়ের প্রতিশোধ হিসেবে তাদের কাজে দেবতারাও তাদের সমর্থন দিচ্ছেন। সব গোত্রের সমন্বয়ে বুডিকা প্রায় এক লাখ সৈন্য সংগ্রহ করেছিলেন বলে জানা যায়। রোমানরা তখন ড্রুয়িডসদের সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত ছিলো। পশ্চিম ব্রিটেন ও উত্তর ওয়েলসে স্থানীয় এই গোত্রের বিদ্রোহ দমনেই ছিলো তাদের মনোযোগ। রাণী বুডিকা এই সুযোগকে কাজে লাগানোর চিন্তা করেন।

 

বুডিকার প্রথম আক্রমণ ছিলো কামুলোডানাম অর্থাৎ বর্তমান কোলচেস্টারে। রোমানরা এ অঞ্চলের নিরাপত্তা সম্পর্কে এতটাই নিশ্চিন্ত ছিলো যে প্রায় অরক্ষিত অবস্থায় আক্রমণের সুযোগ পায় বুডিকার সৈন্যদল। ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ ও হত্যাকান্ড চালানো হয় সেখানে। তৎকালীন রোমান গভর্নর ছিলেন গায়েস সুয়েটনিয়াস পলিনাস। বুডিকার পরবর্তী আক্রমণ তাদের বাণিজ্য ঘাঁটি লন্ডনিয়াম (বর্তমান লন্ডন) বুঝতে পেরে সেখানে ছুটে যান সুয়েটনিয়াস। তবে বুডিকার যুদ্ধ প্রস্তুতি ও ধ্বংযজ্ঞের কথা জানতে পেরে লন্ডনিয়ামকে বাঁচানোর আশা পরিত্যাগ করে পালিয়ে যান।

 

কমুলোডানামের পর লন্ডনিয়াম ও ভেরুলামিয়াম (বর্তমান সেন্ট আলবানস) শহর ধ্বংস করে বুডিকার সেনাবাহিনী। প্রতিশোধের নেশায় উন্মত্ত হয়ে চোখের সামনে পড়া সব রোমান প্রজাদের হত্যা করে তারা। আগুন জ্বালিয়ে শ্মশানে পরিণত করা হয় শহরকে। প্রায় ৭০ থেকে ৮০ হাজার রোমান সৈন্য, নাগরিক ও তাদের সহযোগী বিট্রিস নিহত হয় এই ধ্বংসযজ্ঞে। অবস্থা বেগতিক দেখে সম্রাট নিরো তার সৈন্যবাহিনী প্রত্যাহার করে সরিয়ে নেন। পরপর তিনটি শহর বিপর্যস্ত করে, রোমান সৈন্যদের তাড়িয়ে দিয়ে জয় নিশ্চিত বলে ধরে নিয়েছিলেন রাণী বুডিকা।  এক্ষেত্রে তিনি ছিলেন ভুল। সৈন্যবাহিনী সরিয়ে নেয়া রোমানদের ধূর্ত চাল ছিলো। নতুন করে রণকৌশল সাজাচ্ছিল রোমানরা।

 

বুডিকার সঙ্গে রোমানদের সর্বশেষ যুদ্ধ অনুষ্ঠিত হয়েছিল তৎকালীন রোমান রোডে (বর্তমান পশ্চিম মিডল্যান্সের ওয়াটলিং স্ট্রিটে)। রোমানরা সুসজ্জিত ১০ হাজার সৈন্যবাহিনী নিয়ে রণক্ষেত্রে এসেছিল। বুডিকার সৈন্য সংখ্যার তুলনায় যা ছিলো নিতান্তই নগণ্য। তবে রোমান সৈন্যদের ছিলো উন্নত প্রশিক্ষণ, পরিকল্পিত রণকৌশল, শৃঙ্খল বিন্যাস। যথাযথ কৌশলের অভাবে কোণঠাসা হয়ে পড়ে বুডিকার সৈন্যদল। রোমান বাহিনী তাদের নির্মমভাবে পরাজিত করে। সেই যুদ্ধে প্রায় বুডিকার ৮০ হাজার সৈন্য ও স্থানীয় গোত্রের সাধারণ মানুষ নিহত হয়। অপরদিকে রোমান সৈন্য নিহত হয় ৪০০ জন।

 

যুদ্ধে পরাজিত হয়ে রোমানদের হাতে ধরা না দিয়ে পালিয়ে যান রাণী বুডিকা। তার মৃত্যুর রহস্য উন্মোচন হয়নি আজো। অনেকের মতে, বুডিকা বিষ পান করে আত্মহত্যা করেন। ক্যাসিয়াস ডিও এর বর্ণনা অনুযায়ী, রাণী বুডিকা অসুস্থ হয়ে মৃত্যুবরণ করেন। বুডিকার সমাধিক্ষেত্র নিয়েও বিতর্ক রয়েছে। কারো মতে, স্টোনহেঞ্জে তার সমাধিস্থল। আবার কেউ কেউ বলেন, উত্তর লন্ডনের হ্যাম্পস্টিডের নরফোকে বুডিকার সমাধি রয়েছে।

 

যদিও অনেকদিন পর্যন্ত বুডিকার কীর্তি মানুষের কাছে অজানা ছিলো। ১৩৬০ সালে ট্যাসিটাসের বই ‘দ্য এনালস অব ইম্পেরিয়াল রোম‘ আবিষ্কৃত হওয়ার পর এই বীরের আখ্যান মানুষ জানতে পারে। ওয়েস্টমিনিস্টার ব্রিজের পাশে ১৯০৫ সালে বুডিকা ও তার দুই কন্যার ব্রোঞ্জের ভাস্কর্য স্থাপিত হয়েছে। ব্রিটিশ স্বাধীনতার ইতিহাসে এই বীর যোদ্ধার নাম স্বর্ণাক্ষরে মুদ্রিত।

দৈনিক জামালপুর
দৈনিক জামালপুর