শুক্রবার   ১৫ নভেম্বর ২০১৯   অগ্রাহায়ণ ১ ১৪২৬   ১৭ রবিউল আউয়াল ১৪৪১

দৈনিক জামালপুর
২৩

লালমনিরহাটে কৃষিতে স্বপ্ন দেখাচ্ছেন কৃষক ও তার ভাতিজা

প্রকাশিত: ৮ নভেম্বর ২০১৯  

লালমনিরহাট সদর উপজেলার মোগলহাট ইউনিয়নের দুরাকুটির কৃষক আমজাদ হোসেন ও মজিবর রহমান। সম্পর্কে তারা চাচা-ভাতিজা। চার বছর ধরে বাণিজ্যিকভাবে শীতকালীন সবজি চাষ করে আলোড়ন সৃষ্টি করেছেন সফল দুই চাষি। প্রতিবারের ন্যায় এবারো সাড়ে তিন একর জমিতে সবজি ক্ষেত চাষে নেমেছেন তারা। তাদের এমন সফলতা দেখে স্থানীয় কৃষকরা সবজি চাষে লাভের স্বপ্ন দেখছেন।

 

আমজাদ হোসেন ও মজিবর রহমান বলেন, সবজির কদর সারাদেশে রয়েছে। তবে আগাম চাষ করতে পারলে আরো বেশি মুনাফা পাওয়া যায়। আধুনিক পদ্ধতি ব্যবহার করলে কীটনাশক মুক্ত সবজি চাষ করা সম্ভব। সবজি ক্ষেতে পোকামাকড় আক্রমণ করবেই। সেজন্য কীটনাশক ব্যবহার না করে আধুনিক পদ্ধতি ব্যবহার করে পোকামাকড় দমন করাও সম্ভব। ক্ষেতে কীটনাশক ব্যবহার কম থাকায় সবজির গুণগত মানও ভালো হয়। 

 

তারা আরো বলেন, শীতকালীন সবজির বাজার ধরতে ফুলকপি ও বাঁধাকপির চারা রোপণ করা হয়েছে। কার্তিক মাসের শেষ দিকে সবজি বাজারে উঠবে। এজন্য নার্সারি থেকে সবজি চারা সংগ্রহ করে ২০ থেকে ২৫ দিন আগে রোপণ করা হয়েছে। সাড়ে তিন একর জমিতে প্রায় ৩৫-৩৮ হাজার কপির চারা রোপণ করা হয়েছে। প্রতিটি চারার পেছনে খরচ হয়েছে প্রায় পাঁচ থেকে সাত টাকা। আড়াই থেকে তিন মাস পর প্রতিটি কপি ক্ষেতেই বিক্রি হবে ১৫ থেকে ২০ টাকায়। তিন মাস পর কপি ক্ষেত থেকে সাড়ে তিন থেকে চার লাখ টাকা আয় করা যাবে।

 

এদিকে, চাচা-ভাতিজার সবজি বিপ্লব দেখে ওই এলাকায় প্রতিনিয়ত সবজি চাষির সংখ্যা বাড়ছে। এমাগলহাটে রয়েছেন প্রায় অর্ধশত সবজি চাষি। যারা আধুনিক পদ্ধতি ব্যবহার করে বাণিজ্যিকভাবে সবজি চাষ করছেন। 

 

ওই এলাকার কৃষক ছকমল হোসেন ও মিজানুর রহমান জানান, সবজি চারা রোপণের আগে জমি তৈরি করে কিছু দিন রাখা হয়। এতে কপির চারা রোগ প্রতিরোধের ক্ষমতা সঞ্চয় করে ও গাছগুলো সবল হয়। এছাড়া দেশের বিভিন্ন নার্সারি থেকে চারা সংগ্রহ করে রোপণ করেছেন তারা। তবে এ বছর বৃষ্টি কম হওয়ায় তাদের নিজের চারাগুলো নষ্ট হয়নি। ফলে উৎপাদন খরচ কিছুটা কম হওয়ার আশা করছেন।

 

শুধু মোগলহাট এলাকায় নয় লালমনিরহাটের বিভিন্ন অঞ্চলে আগাম শীতের সবজি চাষ হচ্ছে। সবজি চাষের ব্যাপকতার জন্য আদিতমারী উপজেলার কমলাবাড়ি, সারপুকুর, ভেলাবাড়ি, দুর্গাপুর, সদর উপজেলার বড়বাড়ি, গোকুন্ডা, মোগলহাট, মহেন্দ্রনগর, কালীগঞ্জ উপজেলার চলবলা, মদাতি, চন্দ্রপুর, হাতীবান্ধা উপজেলার সিন্দুর্না, ভেলাগুড়ি, সিংগিমারী, টংভাঙ্গা, পাটগ্রাম উপজেলার বাউরা ও কুচলিবাড়ি ইউপির বাণিজ্যিকভাবে চাষ হচ্ছে বিভিন্ন জাতের সবজি। শীতের শুরুতে ট্রাকে ট্রাকে ঢাকাসহ দেশে বিভিন্ন জেলায় এ সবজি যাবে।

 

কমলাবাড়ি গ্রামের সবজি চাষি আমিন মিয়া জানান, সবজি চাষের জন্য জমি প্রস্তুতের কাজ চলছে। এ সপ্তাহেই মুলার বীজ বপন ও কপির চারা রোপণ করবেন তিনি। কপি চারা রোপণ থেকে ৭৫ থেকে ৮০ দিনের মধ্যে ফসল বাজারে তোলা যায়। এ বছর তিন বিঘা জমিতে বিভিন্ন জাতের সবজি চাষের প্রস্তুতি নিচ্ছেন তিনি।

 

এদিকে সবজি ক্ষেতে কাজ করা দিনমজুর মোজাম্মেল হকসহ অনেকে জানান, প্রচন্ড গরমে ক্ষেতে কাজ করতে সমস্যা হয়। তাছাড়া যে পরিশ্রম করেন, সে তুলনায় পর্যাপ্ত পারিশ্রমিক পান না। হাট বা বাজারে গেলেই ৫০ থেকে ১০০ টাকা খরচ হয়। আর পারিশ্রমিক পান মাত্র ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা। এ টাকায় চাল, ডালসহ সবজি কেনা সম্ভব হয় না। মালিকরা এখানে বেশি লাভবান হচ্ছে বলে দাবি করেন তারা।

 

লালমনিরহাট কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের তথ্যানুযায়ী, গত বছর জেলায় ছয় হাজার ২০৫ হেক্টর জমিতে আগাম জাতের সবজি চাষ হয়েছে। চলতি বছরে সাড়ে ছয় হাজার হেক্টর জমিতে সবাজি চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে চলতি সপ্তাহে প্রায় এক হাজার ৭০০ হেক্টর জমিতে রবি ১৮ ও ১৯ জাতের আগাম সবজি চাষ হয়েছে। মার্চের মধ্যবর্তী পর্যন্ত সবজির চারা রোপণ ও বপন চলবে।

 

লালমনিরহাট সদর উপজেলার উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা রেজাউল করিম বলেন, যে ফসলে মুনাফা, সেই ফসলে ঝুঁকে পড়ছে কৃষকরা। শুধু এ জেলায় নয়, সারাদেশে সবজির ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। তাই কৃষকরা অধিক মুনাফা লাভের স্বপ্নে আগাম সবজি চাষে ঝুঁকে পড়েছেন। 

 

লালমনিরহাট কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক বিদু ভুষণ রায় বলেন, কৃষি বিভাগের লোক নিয়মিত মনিটরিং করায় আধুনিক পদ্ধতির ব্যবহার বেড়েছে। এ পদ্ধতি ব্যবহারের ফলে উৎপাদন বাড়ায় মুনাফাও কয়েকগুণ বেড়েছে। চাষিরা বাণিজ্যিকভাবে বিভিন্ন জাতের সবজি চাষ করে দেশের অর্থনীতিতে ব্যাপক অবদান রাখছে।

দৈনিক জামালপুর
দৈনিক জামালপুর
এই বিভাগের আরো খবর