• রোববার   ২৯ নভেম্বর ২০২০ ||

  • অগ্রাহায়ণ ১৪ ১৪২৭

  • || ১৩ রবিউস সানি ১৪৪২

দৈনিক জামালপুর
সর্বশেষ:
কুড়িগ্রামে সাংবাদিকদের সাথে সাইবার অপরাধ বিষয়ক কর্মশালা ষড়যন্ত্রকারীদের থেকে সতর্ক থাকতে আহ্বান জানালেন তথ্যমন্ত্রী ১০ বছরে দেশের সাড়ে পাঁচ লাখ অসহায়দের আইনি সহায়তা দিয়েছে সরকার “করোনার মধ্যেও দেশের সব খাতে উন্নয়ন অগ্রযাত্রা চলমান” দেশে কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে নতুন শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা হচ্ছে কুড়িগ্রামে শিশু ধর্ষণের ঘটনায় অভিযুক্ত দুই সন্তানের জনক গ্রেপ্তার কাজিপুরে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা (আসক) এর যাত্রা শুরু রৌমারীতে ভূমি ও গৃহহীনদের ঘর নির্মাণ উদ্বোধন শিক্ষা ও গবেষণায় এগিয়ে নেয়ার অঙ্গীকারে বশেফমুবিপ্রবি উল্লাপাড়ায় চোরাই গরুসহ কসাই গ্রেফতার

সুখবর দেশের ইস্পাত শিল্পে

দৈনিক জামালপুর

প্রকাশিত: ২২ অক্টোবর ২০২০  

যে চীন থেকে এক সময় ইস্পাতের কাঁচামাল বিলেট আমদানি করে রড তৈরি করা হতো, সেই চীনেই এখন বিলেট রপ্তানি করছে বাংলাদেশ। প্রথমবারের মতো চীনে ২৫ হাজার টন বিলেট পাঠাচ্ছে বাংলাদেশের জিপিএইচ গ্রুপ। আগামী মাসে ১ কোটি ১ লাখ ৭৫ হাজার ডলার বা ৮৬ কোটি টাকা মূল্যের বড় চালান রপ্তানি করে ইস্পাতের বিশ্ববাজারে প্রবেশ করছে লাল-সবুজের দেশ।
বিলেটের লাখো কোটি টাকার বাজার ধরতে চীন, ভারত, জাপান, যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া, জার্মানি, তুরস্ক, ব্রাজিল, তাইওয়ান, ভিয়েতনাম ও ইউক্রেনের সঙ্গে এখন প্রতিযোগিতায় নামল বাংলাদেশও।
রড উৎপাদনের প্রধান কাঁচামাল হলো বিলেট। এটি উত্তপ্ত করে ছাঁচে ফেলেই রড তৈরি করা হয়। বিলেট উৎপাদনে বিশ্বে নেতৃত্ব দিচ্ছে এখন চীন। মোট বাজারের প্রায় অর্ধেক এখন এককভাবে নিয়ন্ত্রণ করছে তারা।
ইস্পাত ব্যবসায়ীরা বলছেন, বিশ্বে বিলেটের বাজার লাখো কোটি টাকার। এই বাজার ধরতে বাংলাদেশের সামনে এখন বাধা আছে তিনটি। রপ্তানির ওপর এখন ৫ থেকে ২০ শতাংশ পর্যন্ত ইনটেনসিভ দেয় সরকার। এই ইনটেনসিভের সর্বোচ্চটুকু চান তারা। এটির পাশাপাশি সমুদ্রবন্দরে বার্থিং ও সড়ক পরিবহনে চান অগ্রাধিকার। বিলেট উৎপাদনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ গ্যাস ও বিদ্যুৎ সহজলভ্য হলে এ পণ্যটি রপ্তানি কয়েকগুণ বাড়বে বলে মনে করেন এই খাতের ব্যবসায়ীরা। আর রপ্তানি বাড়লে বাংলাদেশের অর্থনীতি আরও এগিয়ে যাবে।
জিপিএইচ গ্রুপের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম বলেন, 'বিলেট উৎপাদনে ইলেকট্রিক আর্ক ফার্নেসের সর্বশেষ প্রযুক্তি কোয়ান্টাম ইএএফ ব্যবহারে আমাদের কারখানাটি এশিয়ায় প্রথম। এটি বিশ্বের তৃতীয় সর্বাধুনিক কারখানা। প্রায় ১৫০ একর জায়গা নিয়ে সীতাকুণ্ডের কুমিরা এলাকায় গড়ে উঠেছে এ কারখানা। এতে ধাপে ধাপে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে কর্মসংস্থান হবে প্রায় ১০ হাজার মানুষের।'
জিপিএইচ ইস্পাতের অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এএমডি) মোহাম্মদ আলমাস শিমুল বলেন, 'ইলেকট্রিক আর্ক ফার্নেস কোয়ান্টাম বা ইএএফ কোয়ান্টাম ইস্পাত শিল্পের সর্বাধুনিক প্রযুক্তি। এর চেয়ে উন্নত ও আধুনিক প্রযুক্তি এখনও আবিস্কার হয়নি। পরিবেশবান্ধব ও জ্বালানি সাশ্রয়ী এ প্রযুক্তিতে একই জ্বালানিকে পুনরায় ব্যবহার করা হয়। তাই জ্বালানির অপচয় হয় না বললেই চলে। এটি কারখানার উৎপাদনশীলতা বাড়ায়। এতে পণ্যের উৎপাদন ব্যয়ও কম হয়। সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতিতে উৎপাদন প্রক্রিয়া পরিচালিত হয় বলে এতে সর্বোচ্চ মাত্রায় পণ্যের মানও নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। এভাবে মান নিয়ন্ত্রণ করেছি বলেই চীনে প্রথমবারের মতো ২৫ হাজার টন বিলেট রপ্তানি করতে পারছি আমরা। এটির মাধ্যমে আমরা বাংলাদেশকে অনন্য এক উচ্চতায় নিয়ে যেতে চাই। সরকার থেকে নীতি সহায়তা পেলে বিলেটের লাখো কোটি টাকার বিশ্ববাজারে আরও বড় পরিসরে প্রবেশ করতে পারব।'
জানা গেছে, বিশ্বে ইএএফ কোয়ান্টাম প্রযুক্তির ইস্পাত কারখানা থাকলেও এখন পর্যন্ত কোথাও একই সঙ্গে উভয় প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়নি। জিপিএইচ ইস্পাতই প্রথম একই ছাদের নিচে ইএএফ কোয়ান্টাম প্রযুক্তির সমন্বয় ঘটিয়েছে। জিপিএইচের সম্প্রসারিত নতুন কারখানাটি হচ্ছে একক শেডের নিচে দেশের সবচেয়ে বড় ইস্পাত কারখানা। একই সঙ্গে দেশে বেসরকারি খাতে কোনো একক প্রকল্পে এটিই সবচেয়ে বড় বিনিয়োগ।
বাংলাদেশ স্টিল ম্যানুফ্যাকচারিং অ্যাসোসিয়েশনের (বিএসএমএ) তথ্যানুযায়ী, ছয় বছর আগেও চাহিদার ৬০ শতাংশ বিলেট আমদানি করতে হতো। দেশে উৎপাদন হতো ৪০ শতাংশ। আর এখন উল্টো রপ্তানি করছে বাংলাদেশ। এটির নেপথ্যে কাজ করেছে সরকারি একটি সিদ্ধান্ত। চার বছর আগে বিলেট আমদানিতে শুল্ক্কহার বাড়িয়ে দেয় সরকার। এ জন্য নতুন নতুন কারখানা গড়ে তুলেছেন উদ্যোক্তারা। মনোযোগ দিয়েছেন কারখানার আধুনিকায়নেও। এতে করে বিলেট উৎপাদনে সক্ষমতা অর্জন করেছে বাংলাদেশ। বজায় রাখতে পারছে মানও।
বিএসআরএম গ্রুপের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক (ডিএমডি) তপন সেন গুপ্ত বলেন, 'আমরা রড উৎপাদর শুরু করি ১৯৫২ সালে। তবে বিলেট উৎপাদন করছি ১৯৯৬ সাল থেকে। এখন বিএসআরএম গ্রুপের বিলেট উৎপাদন ক্ষমতা প্রায় ২০ লাখ টনে উন্নীত হয়েছে। আমাদের এখন আর বিলেট আমদানি করতে হয় না।'
বিলেট উৎপাদনে এখন দ্বিতীয় অবস্থানে আছে আবুল খায়ের গ্রুপ। তাদের বার্ষিক রড উৎপাদন ক্ষমতা প্রায় ১২ লাখ টন। এই কোম্পানির বিলেট উৎপাদন ক্ষমতাও একই পরিমাণ। এ জন্য তাদেরও বিলেট আমদানি করতে হচ্ছে না। বাজারে তৃতীয় অবস্থানে আছে কেএসআরএম গ্রুপ। এই প্রতিষ্ঠানের ডিএমডি শাহরিয়ার জাহান বলেন, 'কেএসআরএমের রড উৎপাদন ক্ষমতা প্রায় ৮ লাখ টন। ২০১৪ সালে আমরা বিলেট উৎপাদন ক্ষমতা বাড়িয়ে ৬ লাখ টনে উন্নীত করেছি। এখন তা আরও বেড়ে ৮ লাখ টনে উন্নীত হয়েছে ধাপে ধাপে।'
বিলেট উৎপাদনে জিপিএইচ গ্রুপও এখন স্বয়ংসম্পূর্ণ। সর্বাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে সীতাকুণ্ডে যে কারখানা তারা গড়ে তুলেছে, তাতেই বার্ষিক ৮ লাখ ১৫ হাজার টন উৎপাদন ক্ষমতা আছে জিপিএইচের।

অত্যাধুনিক প্রযুক্তির নতুন কারখানা দিয়ে দেশের বাজারে শক্ত অবস্থান নিতে মরিয়া এখন গোল্ডেন ইস্পাতও। গোল্ডেন ইস্পাতের পরিচালক মোহাম্মদ সারওয়ার আলম বলেন, '১৯৮৪ সালে প্রতিষ্ঠিত গোল্ডেন আয়রন ও ১৯৮৭ সালে প্রতিষ্ঠিত গোল্ডেন স্টিল নামে দুটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে আমরা এখন ৪০ গ্রেডের রড উৎপাদন করে যাচ্ছি। এখন ৫০০-৫৫০ টিএমটি বার উৎপাদন দিয়ে গোল্ডেন ইস্পাতের পথচলা শুরু হয়েছে। চট্টগ্রামে সীতকুণ্ডের বড় কুমিরা এলাকায় বার্ষিক দুই লাখ টন উৎপাদন ক্ষমতাসম্পন্ন অটো রি-রোলিং মিলটি ২০১৮ সালে উৎপাদনে গেছে। জার্মানির প্রযুক্তি ব্যবহার করে নতুন করে আরও সম্প্রসারণ করছি আমাদের ইস্পাত ইউনিট।'
বাংলাদেশ স্টিল ম্যানুফ্যাকচারিং অ্যাসোসিয়েশনের হিসাবে বর্তমানে দেশে স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতির রড তৈরির কারখানা রয়েছে অর্ধশত। আর সনাতন পদ্ধতির ছোট আকারের কারখানা রয়েছে প্রায় ১২০টি। সব কারখানা মিলিয়ে বার্ষিক রড, চ্যানেল, অ্যাঙ্গেলসহ লং স্টিল পণ্য উৎপাদন সক্ষমতা ৯০ লাখ টন। দেশের বার্ষিক চাহিদা ৮০ লাখ টন।
ইবিএলের প্রতিবেদন অনুযায়ী, আবুল খায়ের, বিএসআরএম, জিপিএইচ ও কেএসআরএম বিলেট সক্ষমতার ৯০ শতাংশের বেশি উৎপাদন করে; যা দেশের বার্ষিক চাহিদার ৫০ শতাংশের বেশি।
এদিকে বাংলাদেশে এসেও ইস্পাতের বাজারে জোরালো অবস্থান তৈরি করতে যাচ্ছে চীনারা। কুনমিং আয়রন ও স্টিল হোল্ডিং কোম্পানি (কেআইএসসি) ২৩০ কোটি ডলার বিনিয়োগ করতে যাচ্ছে বাংলাদেশে। এ ছাড়া পাঁচ থেকে সাত বছরে বাজারের বর্তমান কোম্পানিগুলো আরও ৪০০ কোটি ডলার বিনিয়োগ করবে এ খাতে। ২০১৯ সালে বিশ্বে অশোধিত ইস্পাত উৎপাদন হয় ১৮৬ কোটি ৯০ লাখ টন; যা ২০১৮ সালের চেয়ে ৩ দশমিক ৪ শতাংশ বেশি। এর মধ্যে এশিয়ায় উৎপাদিত হয় ১৩৪ কোটি ১০ লাখ টন; যা আগের বছরের চেয়ে ৫ দশমিক ৭ শতাংশ বেশি।
ক্রমবর্ধমান এই বিশ্ববাজার ধরতেই দেশে সর্বাধুনিক প্রযুক্তির কারখানা স্থাপন করেছে জিপিএইচ গ্রুপ। চলতি ২০২০-২১ অর্থবছরে ১০ কোটি ডলারের ইস্পাত পণ্য রপ্তানি করতে চায় প্রতিষ্ঠানটি। জিপিএইচ কর্তৃপক্ষ জানায়, ২০১৮ সালে বাংলাদেশ থেকে প্রথম বিলেট রপ্তানি করেছিল তারা শ্রীলঙ্কায়। কিন্তু এটি ছিল আড়াই হাজার টনের ছোট চালান। এর বাইরে ভারতের সাতটি রাজ্যেও অনিয়মিতভাবে বিএসআরএমসহ দেশের কয়েকটি প্রতিষ্ঠান রড রপ্তানি করেছে। তবে এবারের মতো বিলেটের এত বড় চালান অতীতে কখনও রপ্তানি হয়নি বলে জানান জিপিএইচ ইস্পাতের এএমডি মোহাম্মদ আলমাস শিমুল।

দৈনিক জামালপুর
দৈনিক জামালপুর