• শুক্রবার ০১ ডিসেম্বর ২০২৩ ||

  • অগ্রহায়ণ ১৬ ১৪৩০

  • || ১৭ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৫

দৈনিক জামালপুর

প্রবৃদ্ধি ও উন্নয়নে প্রয়োজন ভারসাম্য

দৈনিক জামালপুর

প্রকাশিত: ৫ নভেম্বর ২০২৩  

বাংলাদেশ স্বাধীনতার ৫০ বছর উদ্্যাপন করে ৫২ বছর অতিক্রম করছে। অনেক চড়াই-উতরাই পেরিয়ে বিশাল জনসংখ্যার এ দেশ একটি সন্তোষজনক অবস্থায় পৌঁছেছে। অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক কর্মকা- ও বিশে^র অন্যান্য দেশের সঙ্গে যোগাযোগের মাধ্যমে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বেড়েছে। কিন্তু প্রবৃদ্ধির সঙ্গে সামাজিক ও 
সার্বিক উন্নয়ন অর্জন করতে এখনো সক্ষম হয়নি

একটি দেশ অর্থনৈতিকভাবে কতটা উন্নতি করেছে তার প্রধান নিয়ামক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি। আর উন্নয়ন হলো কোনো ব্যক্তি বা সমাজের সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক অগ্রগতির একটি প্রক্রিয়া। বাস্তবিক অর্থে অর্থনৈতিক উন্নয়ন হলো মানুষের কল্যাণের লক্ষ্যে একটি নীতিগত হস্তক্ষেপ। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হলো অর্থনৈতিক উন্নয়ন প্রক্রিয়ার একটি দিক। সম্প্রতি উন্নয়ন শব্দটির সঙ্গে টেকসই শব্দটি যুক্ত হয়েছে। টেকসই উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় পরিবেশ সুরক্ষা ও নারীর অংশগ্রহণ ও অপরিহার্য। সুশাসন ও জবাবদিহিতা টেকসই উন্নয়নের পূর্ব শর্ত। প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতা ছাড়া উন্নয়ন টেকসই হয় না।

জবাবদিহিতার ঘাটতির কারণে দেশের আর্থিক খাত থেকে শুরু করে বাজার ব্যবস্থাপনা ও প্রশাসনিক কাজে ক্রটি দেখা যাচ্ছে। প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতা না থাকলে উন্নয়নের  পথ মসৃণ হয় না। মাথাপিছু আয় যদি দ্বিগুণও হয় আর দারিদ্র্য, বেকারত্ব, অসম আয় যদি সামাজিকভাবে বেড়ে যায় তাহলে অর্থনৈতিক উন্নয়ন হয়েছে বলা যাবে না। আধুনিক অর্থনীতিবিদ মাইকেল টোডারের মতে অর্থনৈতিক উন্নয়ন হলো- একটি বহুমুখী প্রক্রিয়া। যার মাধ্যমে সামাজিক কাঠামো ও দৃষ্টিভঙ্গি এবং প্রতিষ্ঠানসমূহের পরিবর্তন ঘটে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত হয়। সামাজিক বৈষম্য ও দারিদ্র্য দূর হয় এবং কর্মসংস্থান বৃদ্ধি পায়। 
বাংলাদেশ স্বাধীনতার ৫০ বছর উদযাপন করে ৫২ বছর অতিক্রম করছে। অনেক চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে বিশাল জনসংখ্যার এ দেশ একটি সন্তোষজনক অবস্থায় পৌঁছেছে। অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক কর্মকা- ও বিশে^র অন্যান্য দেশের সঙ্গে যোগাযোগের মাধ্যমে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বেড়েছে। কিন্তু প্রবৃদ্ধির সঙ্গে সামাজিক ও সার্বিক উন্নয়ন অর্জন করতে এখনো সক্ষম হয়নি। বিগত ৫০ বছরে যতটুকু প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে তার চেয়ে সামাজিক বৈষম্য বেশি তৈরি হয়েছে। রাষ্ট্রের মাধ্যমে যেসব সেবা, বিনিয়োগ ও সুবিধা বণ্টন করা হয়েছে তা সবার কাছে পৌঁছায়নি। প্রবৃদ্ধির সুফল মধ্যবিত্ত, দরিদ্র ও প্রান্তিক মানুষের কাছে আপেক্ষিকভাবে কম পৌঁছাচ্ছে। আয় ও সম্পদের বৈষম্য দিন দিন বেড়ে যাচ্ছে। দেশের আর্থিক খাতে শৃঙ্খলাহীনতার কারণে খেলাপি ঋণ দিন দিন  বেড়ে  যাচ্ছে, বেড়ে যাচ্ছে নানা অনিয়ম, মুদ্রা পাচার ও দুর্নীতি। ব্যাংকে রয়েছে সুশাসনের অভাব ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকে নজরদারির ঘাটতি। 

আমাদের রপ্তানি বাণিজ্যও চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে। রেমিটেন্স মোটামুটি ভালো গতিতে আগালেও প্রবাসী শ্রমিকদের অদক্ষতা ও দিক নির্দেশনার অভাবে কাক্সিক্ষত হারে রেমিটেন্স আসছে না। মূল্যস্ফীতি দিন দিন বেড়ে যাচ্ছে। চলতি বছরে (২০২৩) আগস্ট সেপ্টেম্বরে খাদ্য মূল্যস্ফীতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১২ শতাংশের ও বেশি। পাশাপাশি সার্বিক মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে সর্বোচ্চ সাড়ে নয় শতাংশ। মূল্যস্ফীতির বিপরীতে গড় মজুরির হার বাড়েনি। গত ১ বছরে মজুরির গড় হার সাড়ে সাত শতাংশ বেড়েছে যা মূল্যস্ফীতির হারের চেয়ে কম। চলতি অর্থবছরের (২০২৩-২০২৪) প্রথম তিন মাসে মূল্যস্ফীতি, প্রবাসী আয়, রপ্তানি আয়, বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভ, খেলাপি ঋণ ও রাজস্ব আয় সব সূচকের অবস্থান সন্তোষজনক নয়। অর্থনীতিতে এ সকল সংকট কেন তৈরি হয়েছে? এর বেশকিছু কারণ রয়েছে।

আমাদের ২০টি মেগা প্রকল্পের ক্ষেত্রে গড়ে বছরে জিডিপির ১ শতাংশ করে ব্যয় করা হয়েছে। ২০ মেগা প্রকল্পে বড় ধরনের অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এসব প্রকল্পের অনেকগুলোই অর্থনৈতিকভাবে কার্যকর বা যৌক্তিক নয় বলে প্রকাশ পাচ্ছে। বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট কিংবা মাতারবাড়ি প্রকল্প অপ্রয়োজনীয় প্রকল্পের উদাহরণ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে। রূপপুর পারমাণবিক কেন্দ্রও খুব একটা লাভজনক হবে বলে মনে করা হচ্ছে না। 
কর হলো জিডিপির মাত্র ৯ শতাংশ। জিডিপির প্রায় ১৫ শতাংশ সরকারি ব্যয়, যার মধ্যে ৯ শতাংশ কর থেকে আসে বাকি ৫-৬ শতাংশ থাকে ঘাটতি। সরকার এই ঘাটতির প্রায় ৪০ শতাংশ বৈদেশিক ঋণ দিয়ে পূরণ করে, যার ২ শতাংশ অনুদান। বাকি ৬০ শতাংশ অভ্যন্তরীণ উৎস তথা ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়া। যা সরকারকে ফেরত দিতে হয় সুদসহ। রাজস্ব ব্যয়ের প্রায় ১৮-২০ শতাংশ ব্যয় হয় সুদ পরিশোধ বাবদ। এটা হলো আমাদের দৃশ্যমান উন্নয়ন ধারার অন্যতম সমস্যা। এ দৃশ্যমান উন্নয়ন থেকে সরকার এখনো আয় করতে পারেছ না।

দেশের অর্থনীতিতে বর্তমানে যে সংকট চলছে তার অন্যতম কারণ হলো স্বল্পমেয়াদি আমানতের টাকায় দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্পের কাজ করা। বড় প্রকল্পের কাঁচামাল বিদেশ থেকে আনতে হয়েছে। ফলে ডলারের উপর চাপ সৃষ্টি হয়েছে। অর্থনীতির বর্তমান সংকট একদিনে তৈরি হয়নি। এ সংকটের পেছনে রয়েছে পরিকল্পনার দুর্বলতা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার অভাব, প্রাতিষ্ঠানিক ও কাঠামোগত দুর্বলতা। 
জিডিপির একটি বড় অংশ নিয়ে আন্ডারগ্রাউন্ড অর্থনীতি তৈরি হচ্ছে। দেশের বাইরে হাজার হাজার কোটি টাকা পাচার করা হয়। এই ধারা থেকে অর্থনীতিকে ফেরাতে হলে স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ গ্রহণের কথা বলছেন অর্থনীতিবিদগণ। এ পরিস্থিতিতে অর্থনীতি স্থিতিশীলতায় টেকসই উন্নয়নের জন্য স্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিবেশ গুরুত্বপূর্ণ।
অনেকেই বলেছেন, ‘উন্নয়ন আগে, মানবাধিকার পরে’ টেকসই উন্নয়নের জন্য এ ক্ষুদ্র মস্তিষ্কের চিন্তা থেকে দূরে থাকতে হবে। 
আমাদের যে চ্যালেঞ্জগুলো আছে তার মধ্যে প্রধানতম অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা। তাছাড়া আয় বৈষম্য তো আছেই। আমাদের জনসংখ্যা অনেক, কিন্তু তাদের দক্ষতা কম, এর সঙ্গে শিক্ষা-স্বাস্থ্য ওতপ্রোতভাবে জড়িত। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা বা এসডিজির ১৭টি লক্ষ্যমাত্রা আছে। এগুলোর মধ্যে দারিদ্র্য বিমোচন, নারী উন্নয়ন, প্রাকৃতিক দুর্যোগ  মোকাবিলা, ভূমি ব্যবহারে দূষণ দূর করা। এগুলো যদি ঠিকভাবে পূরণ না হয় তাহলে অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা আমরা কাটিয়ে উঠতে পারব না। আমাদের সামনে যে উন্নয়ন বিচ্যুতি ও চ্যালেঞ্জ ছিল তা আগের চেয়ে অনেক বেশি তীব্র হয়ে উঠেছে। এই জন্য আমাদের প্রধান দায়িত্ব হলো মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আনা।

প্রয়োজনে গুরুত্বপূর্ণ খাতে ভর্তুকি দিতে হবে। এই ক্ষেত্রে  কৃষি উৎপাদন ও খাদ্য নিরাপত্তার ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত। প্রবৃদ্ধির গতিকে সুসংহত ও ত্বরান্বিত করতে হলে স্থিতিশীল রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিবেশ এবং পরিকল্পিত উন্নয়ন কার্যক্রম চালিয়ে যেতে হবে। 
আমাদের অপর্যাপ্ত কর্মসংস্থান সমস্যা মোকাবিলায় উচ্চহারে প্রবৃদ্ধি অর্জনই হবে প্রধান হাতিয়ার। একইসঙ্গে সমতাভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে বৃদ্ধিপ্রাপ্ত আয়ের সুষম বণ্টন নিশ্চিত করতে হবে। আমাদের প্রতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বাড়াতে হবে। স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে না পারলে আমাদের অগ্রগতি বিঘ্নিত হবে।

দৈনিক জামালপুর
দৈনিক জামালপুর