• বৃহস্পতিবার   ৩০ জুন ২০২২ ||

  • আষাঢ় ১৬ ১৪২৯

  • || ২৯ জ্বিলকদ ১৪৪৩

দৈনিক জামালপুর
সর্বশেষ:

গুজব আর অপপ্রচারের জাল ছিন্ন করে উঠল পদ্মা সেতু

দৈনিক জামালপুর

প্রকাশিত: ২২ জুন ২০২২  

এই সেতু হবে না, হলেও টিকবে না- ছিল এমন নানা কথামালা, আর তার আবার ডালপালা মেলছিল নানা গুজব। এই সব পথ পেরিয়েই পদ্মার দুই পাড় বাঁধল ৬ কিলোমিটার দীর্ঘ সেতু, দক্ষিণাঞ্চলের সঙ্গে জোড়া লাগল রাজধানী।

২০১৫ সালে পদ্মা সেতু নির্মাণযজ্ঞ শুরু হলেও তার পরিকল্পনা তারও আগের। আর তাতে বিশ্ব ব্যাংকের সম্পৃক্ততা এবং অভিযোগ তুলে চলে যাওয়া, গোটা বিষয়টা ছিল আলোচনায়, যেখানে ষড়যন্ত্র ছিল বলেও সরকারের ভাষ্য। এর মধ্যেই চলে গুজব আর অপপ্রচার।

বিশাল এই প্রকল্পের মূল সেতু নির্মাণের কাজটি পায় চীনা প্রতিষ্ঠান চায়না মেজর ব্রিজ ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানি। প্রকল্পে চীনের প্রায় ১৫০ প্রকৌশলী এবং ৩৫০ কর্মী যোগ দেয়।

২০১৫ সালের ১ মার্চ মুন্সীগঞ্জের মাওয়ায় মূল সেতুর পরীক্ষামূলক ভিত্তি স্থাপনের সময় নদীতে গরু ও খাসির রক্ত ঢালতে দেখা যায় চাইনিজ ওই প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের। ভাসিয়ে দেওয়া হয় কয়েকটি মুরগিও।

সে সময় জানানো হয়, এটা চীনাদের প্রচলিত রীতি ও বিশ্বাস। তারা বিশ্বাস করেন, বড় কোনো কাজের শুরুতে পশু উৎসর্গ করলে স্রষ্টার সন্তুষ্টি লাভ করা যায়।

চীনা ওই রীতি রীতি নিয়ে বড় কোনো আলোচনা তখন না থাকলেও ২০১৯ সালের মাঝামাঝিতে শুরু হয় গুজব। সোশাল মিডিয়ায় ছড়ানো হয়, পদ্মা সেতু তৈরিতে ‘মানুষের মাথা লাগবে’।

এই গুজব পালে হাওয়া পায় ২০১৯ সালের ১৯ জুলাই নেত্রকোণায় এক যুবকের ব্যাগ থেকে একটি শিশুর মাথা পাওয়ার পর। স্থানীয়দের সন্দেহ হয়, পদ্মা সেতুতে বলি দেওয়ার জন্য ওই যুবক কাটা মাথা সংগ্রহ করছিল।

ওই যুবক গণপিটুনিতে নিহত হয়। সেই সঙ্গে দেশের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে পড়ে ছেলে ধরার গুজব। আর তারমধ্যে দেশের বিভিন্ন স্থানে আক্রান্ত হয় নিরীহ মানুষ।
 
এর মধ্যে সবচেয়ে বেদনাদায়ক ঘটনাটি ঘটে ঢাকার উত্তর বাড্ডায়। ওই বছরের ২০ জুলাই সকালে উত্তর বাড্ডা এলাকায় মেয়েকে স্কুলে ভর্তি করানোর তথ্য জানতে স্থানীয় একটি স্কুলে গিয়েছিলেন তাসলিমা বেগম রেনু নামের এক নারী। তাকে ছেলেধরা সন্দেহে পিটিয়ে মারা হয়।

একই দিনে নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জে ‘ছেলেধরা’ সন্দেহে পিটুনিতে এক ব্যক্তি নিহত হন। একই জেলায় আরেক স্থানে এক নারী হন পিটুনির শিকার।

২১ জুলাই মিনু মিয়া নামের আরেক ব্যক্তি টাঙ্গাইলের কালিহাতীর সয়া হাটে মাছ ধরার জাল কিনতে গিয়ে ছেলেধরা সন্দেহে জনতার পিটুনিতে নিহত হন।

এ তো গেল গুজবের কথা, তার আগে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার পদ্মা সেতু নিয়ে এক কথা তুমুল আলোচনার সৃষ্টি করেছিল। তিনি বলেছিলেন, এই সেতু ভেঙে পড়ে যাবে।

২০১৮ সালের ২ জানুয়ারি ছাত্রদলের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে এক অনুষ্ঠানে খালেদা জিয়া বলেছিলেন, “জোড়াতালি দিয়ে তাড়াহুড়ো করে এই সেতু নির্মাণ করা হচ্ছে। কেউ এই সেতুতে উঠতে যাবে না। কারণ, অনেক ঝুঁকি আছে।”

তার সেই কথার ব্যাখ্যায় বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছিলেন, “পদ্মা সেতু নিয়ে খালেদা জিয়া তো ভুল কিছু বলেননি। এটা সত্য প্রমাণিত হয়েছে যে, পদ্মা সেতু একটা রং ডিজাইনের উপরে নির্মিত হচ্ছে। এটা আমাদের কথা নয়, এটা বিশেষজ্ঞদের কথা।”

সেতু উদ্বোধনের আগে আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের সেই সব কথা স্মরণ করে বলেন, “আগামী ২৫ জুন পদ্মা সেতুর উদ্বোধনের মধ্য দিয়ে মিথ্যাচারের জবাব দেওয়া হবে, জবাব দেওয়া হবে সকল গুজবের।”

১৪ জুন ২০২২: সন্ধ্যায় একসঙ্গে জ্বালানো হয় পদ্মা সেতুর সবগুলো সড়কবাতি।১৪ জুন ২০২২: সন্ধ্যায় একসঙ্গে জ্বালানো হয় পদ্মা সেতুর সবগুলো সড়কবাতি।
ছিল ‘ষড়যন্ত্র’ও

৩০ হাজার কোটি টাকার পদ্মা সেতু নির্মিত হয়েছে নিজস্ব অর্থায়নে; যদিও শুরুতে বিশ্ব ব্যাংকের ঋণ দেওয়ার কথা ছিল এই সেতুতে।

দুর্নীতির অভিযোগ তুলে বিশ্ব ব্যাংক অর্থায়ন স্থগিত করলে তাদের সঙ্গে টানাপড়েনের মধ্যে দেশের টাকায় এই সেতু নির্মাণেরে ঘোষণা দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

বিশ্ব ব্যাংকের সেই অভিযোগ তোলার পেছনে যে একটি ষড়যন্ত্র ছিল, তা বিভিন্ন সময় বলে আসছেন শেখ হাসিনা।

এই ‘ষড়যন্ত্রে’ নোবেলজয়ী বাংলাদেশি মুহাম্মদ ইউনূসের জড়িত থাকার কথা তুলে সাম্প্রতিক এক অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন, “এত চাপ! এই মামলা, যে সমস্ত খেলা। মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানি। এই যে অপমান! স্টেট ডিপার্টমেন্ট দুই দুই বার আমার ছেলেকে সজীব ওয়াজেদ জয়কে ডেকে নিয়ে থ্রেট করেছে যে তোমার মাকে বলো-এমডির পদ থেকে ইউনূসকে সরানো যাবে না।

“গ্রামীণ ব্যাংকের এমডি ড. ইউনূস বেআইনিভাবে ৭১ বছর পর্যন্ত এমডি পদে ছিল। তাকে কোনো অপমান করা হয়নি বরং তাকে ব্যাংকের উপদেষ্টা ইমেরেটাস হওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তাকে এমডি থাকতে হবে!


“এই যে দেশের বিরুদ্ধে কাজ করা। আমরা ওয়ার্ল্ড ব্যাংককে দোষ দিচ্ছি না। কিন্তু এই ওয়ার্ল্ড ব্যাংককে দিয়ে তো এটা করানো হয়েছে। ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের প্রেসিডেন্ট তার শেষ কর্মদিবসে এটার টাকা বন্ধ করে দিয়ে যায়।”

বিশ্ব ব্যাংক অর্থায়ন স্থগিতের পর খালেদা জিয়া এক অনুষ্ঠানে বলেছিলেন, “স্বাধীনতার পর এই প্রথম বিশ্বব্যাংক দুর্নীতির অভিযোগে কোনো উন্নয়ন প্রকল্পে অর্থায়ন স্থগিত করেছে। প্রকল্পের ভাগ্য এখন অনিশ্চিত।”

বিএনপি থেকে শুরু করে বিভিন্ন মহল বিশ্ব ব্যাংকের সেই অভিযোগ নিয়ে সরব হয়েছিল। কিন্তু পরে দুর্নীতি দমন কমিশন তদন্ত করে জানায়, অভিযোগের কোনো সারবত্তাই তারা পায়নি।

জাজিরায় শনিবার পদ্মা বহুমুখী সেতু প্রকল্পের নদীশাসন কাজের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত জনতার উদ্দেশে হাত নাড়েন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ছবি: সাইফুল ইসলাম কল্লোলজাজিরায় শনিবার পদ্মা বহুমুখী সেতু প্রকল্পের নদীশাসন কাজের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত জনতার উদ্দেশে হাত নাড়েন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ছবি: সাইফুল ইসলাম কল্লোল
সেই প্রসঙ্গ তুলে শেখ হাসিনা সম্প্রতি বলেছিলেন, “আমি, আমার বোন রেহানা, আমার ছেলে কেউ বাদ যায়নি। ড. মসিউর রহমান, আমাদের সচিব মোশাররফ, মন্ত্রী আবুল হোসেন এদের ওপর যে জুলুম তারা করেছে এবং যখন অসত্য অপবাদ দিয়ে পদ্মা সেতুর টাকা বন্ধ করে দিল, তখন আমরা বললাম, আমরা নিজের টাকায় করব।“অনেকে বোধহয় ভেবেছিলেন এটা অস্বাভাবিক। কিন্তু আমি বলেছিলাম আমরা করতে পারব। এই আত্মবিশ্বাস আমার ছিল।”

প্রধানমন্ত্রী নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণের ঘোষণা দেওয়ার পরও সংশয় ছিল অনেকের মনে।

তা তুলে ধরে শেখ হাসিনা সম্প্রতি বলেন, “যখন নির্মাণ কাজ শুরু করি, অনেক জ্ঞানীগুণী বলেছিলেন, আওয়ামী লীগ ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করতে পারবে, কিন্তু সেতু সম্পন্ন করতে পারবে না। তাদের কেউ কেউ আমাদের সরকারের সাথেও ছিল।

“কত রকমের কথা এখানে শুনতে হয়েছে। রেললাইন কেন করলাম, সেটা নিয়েও আমাদের অর্থনীতিবিদরা প্রশ্ন তুলেছেন। এই সেতুর দরকারটা কী ছিল, এই কথাটাও কেউ কেউ বলেন।

“আর এর একটাই কারণ ওয়ার্ল্ড ব্যাংক। ওয়ার্ল্ড ব্যাংক ছাড়া কিছু করা যাবে না। তাদের খবরদারি ছাড়া কোন কিছু হবে না। আর বাংলাদেশের কোনো উন্নতি হবে না। আমাকে এটাই বোঝানোর চেষ্টা হয়েছে। আমি বলছি না, আমি মানি না। আমরা পারবো। আর যদি পারি করব, না পারলে করব না।”

এই সেতুকে এখন বাংলাদেশের ‘সক্ষমতা ও আত্মবিশ্বাসের প্রতীক এবং অপমানের প্রতিশোধ’ হিসেবে তুলে ধরছেন শেখ হাসিনা।

আর প্রতিকূলতা পেরিয়ে এই সেতু নির্মাণের কৃতিত্ব শেখ হাসিনাকেই দিচ্ছেন সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের।

তার ভাষায়, “পদ্মা সেতু শেখ হাসিনার স্বপ্নের সেতু। শেখ হাসিনা প্রমাণ করেছেন যে আমরাও পারি। পদ্মা সেতু শেখ হাসিনার অসীম সাহসের সোনালি ফসল। সেতু নির্মাণের সব কৃতিত্ব শুধু তার।”

দৈনিক জামালপুর
দৈনিক জামালপুর