• রোববার   ২৪ অক্টোবর ২০২১ ||

  • কার্তিক ৯ ১৪২৮

  • || ১৬ রবিউল আউয়াল ১৪৪৩

দৈনিক জামালপুর

`মেজর রিট্রিট` জিয়াউর রহমান কি আইএসআই-এর গুপ্তচর ছিলেন?

দৈনিক জামালপুর

প্রকাশিত: ৭ অক্টোবর ২০২১  

বাংলাদেশের ইতিহাসে জিয়াউর রহমান যে একটি রহস্যময় চরিত্র্র এ ব্যাপারে বোধহয় কারও দ্বিমত নেই। 

আপনি না পারবেন তাকে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে গণ্য করতে, না পারবেন তাকে দেশের কথিত শাসক হিসেবে অস্বীকার করতে। বলা হয় বাংলাদেশের সকল কলঙ্কের সূচনা হয়েছে জিয়ার সম্পৃক্ততায়। কিন্তু এক সময়ের সামরিক শাসক এবং অন্যতম বৃহৎ একটি রাজনৈতিক দলের প্রতিষ্ঠাতাকে পাকিস্তানের এজেন্ট সম্বোধন করাকে কেউ কেউ হয়তো রাজনৈতিক বুলি হিসেবে গণ্য করতে পারেন। কিন্তু সততা ও নিরপেক্ষতার সাথে কিছু বিষয় বিবেচনা করলে বিবেকসম্পন্ন যেকেউ একমত হবেন মনন, মানসিকতা ও কর্মকাণ্ডে জিয়া কখনোই বাঙালি হয়ে উঠতে পারেন নি, পাকিস্তানের শেঁকড়ও তিনি ছিন্ন করতে পারেন নি।

১. ভারত ও পাকিস্তান উভয় দেশের গোয়েন্দা সংস্থা এই মর্মে দাবি করেন যে, তাদের "দেশপ্রেমিক" কিছু সদস্য পরিচয় গোপন করে নিজের জীবন উৎসর্গ করেছেন - প্রতিপক্ষ দেশের নাগরিক হয়ে, এমন কি সেই দেশের সশস্র বাহিনীর উচ্চ পদে আসীন থেকে মাতৃভূমির পক্ষে কাজ করে। অর্থাৎ ভারতের দাবি পাকিস্তানে ভারতীয় এজেন্ট দায়িত্বরত ছিল বা আছে, পক্ষান্তরে পাকিস্তানের দাবি ভারতে পাকিস্তানি এজেন্ট রয়েছে। এ নিয়ে অনেক বইও রচিত হয়েছে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট বিবেচনা করলে পাকিস্তানি এজেন্টের সংখ্যা যে কম ছিল না - তা বলার অপেক্ষা রাখে না। বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডসহ দেশের ঐতিহাসিক অনেক ঘটনাই এর সাক্ষ্য দেয়। আর এক্ষেত্রে জামায়াত নেতাদের পাশাপাশি যে নামটি সামনে আসে তা হচ্ছে জিয়াউর রহমান।  

২. জ্ঞান হওয়ার আগেই জিয়া তার পিতামাতার সঙ্গে পাকিস্তান চলে যান। করাচিতে উর্দু মিডিয়ামে পড়াশোনা করে পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে যোগদান করেন। ৭১ এর আগেই পাকিস্তানে জিয়ার পিতামাতার মৃত্যু হয়, তাদেরকে কবরও দেয়া হয়েছে সেখানেই। জিয়ার দুই পুত্রের জন্ম পাকিস্তানে। 

৩. জিয়া ১৯৫৫ সালে সেকেন্ড লেফটেন্যান্ট হিসেবে কমিশন প্রাপ্ত হন (১২ পিএমএ লং কোর্স)। করাচিতে ২ বছর কর্মরত থাকা অবস্থায় তিনি স্পেশাল ইন্টেলিজেন্স কোর্সে উচ্চতর প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। 

উল্লেখ্য এ জাতীয় পদে বাঙালি তথা তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের কাউকে নির্বাচিত করা হতো না। ১৯৫৭ সালে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে স্থানান্তরিত হয়ে আসেন ১৯৫৯ এ ফিরে যান। ১৯৬০ সালে সংক্ষিপ্ত এক সফরে এসে খালেদা জিয়াকে বিবাহ করেন। ১৯৫৯ থেকে ১৯৬৪ সাল পর্যন্ত পাকিস্তান সেনাবাহিনীর গোয়েন্দা বিভাগে (আইএসআইতে) তিনি কাজ করেন। ৭১ পর্যন্ত তিনি বাংলাদেশে ছিলেন প্রায় ৪ বছর এবং তা পেশাগত কারণে। 

৪. ২৫ মার্চ জিয়া চট্টগ্রাম বন্দরে পাকিস্তান থেকে আসা পাকিস্তানি অস্ত্র খালাসের দায়িত্বে ছিলেন।জিয়ার অধীনে থাকা সেনারা পাকিস্তানিদের গণহত্যার কথা ও বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ডাক শুনে পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করার সিদ্ধান্ত নেয়। জিয়া বিদ্রোহ না করার সিদ্ধান্তে অটল থাকলেও সহকর্মীদের বিদ্রোহের পক্ষে কঠোর অবস্থান দেখে নীরবতা অবলম্বন করেন। যখন জিয়া নিজে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভবনা দেখেন তখনই পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করার সিদ্ধান্ত নেন। কারণ পাকিস্তানিদের সিদ্ধান্ত ছিল বাঙালি সেনা দেখা মাত্র হত্যা করা। যুদ্ধে অংশগ্রহণ এর সুযোগ থাকা সত্বেও যুদ্ধের প্রারম্ভে জিয়া তার অনুগতদের নিয়ে ভারতীয় সীমান্তের অভ্যন্তরে নির্বিঘ্নে অবস্থান নেন। এজন্য যুদ্ধের সময় জিয়াকে অনেকেই ‘মেজর রিট্রিট’ হিসেবে সম্বোধন করতেন।

৫. কর্নেল শাফায়াত জামিল, মেজর রফিকুল ইসলাম, সিরু বাঙালি, হারুন হাবীব, শফিউল্লাহ, একে খন্দকার সহ ৭১ এ জিয়াকে কাছে থেকে দেখা অনেক বীর মুক্তিযোদ্ধার চোখে জিয়া ছিলেন প্রশ্নবিদ্ধ একজন। বীর মুক্তিযোদ্ধা লেখকদের প্রায় সকলেই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জিয়াকে মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষের একজন হিসেবে স্বীকৃতি দেন নি। প্রত্যক্ষদর্শী লেখকদের একটি অংশ রাজনৈতিক নিরপেক্ষতারে খাতিরে বড়জোর তাকে বাই-চান্স মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে চিহ্নিত করেন। 

৬. যারা জিয়াকে মুক্তিযোদ্ধা বলেন, তারা মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে জিয়ার কি অবদান ছিল তা উল্লেখ করতে পারেন না বা সঠিক তথ্য প্রমাণ উপস্থাপন করতে পারেন না। বাংলাদেশের প্রতি সহানুভূতি থাকার যৌক্তিক কোনো কারণও খুঁজে পাওয়া যায় না। 

৭. জিয়ার বিতর্কিত ঘোষণা নিয়ে বিএনপির সমর্থকরা কৃতিত্ব দাবি করে থাকে। পাকিস্তান আমল থেকে এখন পর্যন্ত সহস্রাধিক নেতা বিভিন্ন সময়ে সংগ্রামের ডাক দিয়েছেন। এমন কি খালেদা জিয়ার মত অন্যতম বৃহত্তম দলের প্রধানও বহুবার গণঅভ্যূত্থানের ডাক দিয়েছেন। কেউ কি রাজপথে নেমেছে? সামরিক ও গোয়েন্দা কৌশল সম্পর্কে অবগত যেকেউ জিয়ার কথিত ঘোষণার মর্মার্থ অনুধাবন করতে পারবেন। অর্থাৎ ২৭ মার্চ জিয়ার প্রথম বিতর্কিত ঘোষণাটি ছিল মুক্তিযোদ্ধা ও যুদ্ধের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণকারী জনতাকে বিভ্রান্ত করে স্বাধীনতার সংগ্রামকে ভিন্ন দিকে ধাবিত করার অপকৌশল। অখ্যাত ও অজ্ঞাত একজন মেজর নিজের কর্তৃত্বে যুদ্ধের ডাক দিলে ২৩ বছরে তিলে তিলে গড়ে ওঠা স্বাধীনতার সংগ্রাম মিইয়ে যাবে - এটাই ছিল চতুর জিয়ার কৌশল বা পরিকল্পনা। এছাড়া সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হচ্ছে জিয়া কর্তৃক জানজুয়াকে গ্রেফতার করার দাবি করলেও সেই জানজুয়া কিভাবে ঢাকা চলে গেলেন সেই রহস্য অমীমাংসিত। ধারণা করা হয় জিয়ার পরামর্শে খালেদা জিয়া ও জানজুয়া একসঙ্গেই চট্টগ্রাম ত্যাগ করেন। আর তারপরই সেই বিতর্কিত ঘোষণা দেয়া হয়। যুদ্ধের সূচনালগ্নে বিভ্রান্তি ও বিতর্ক সৃষ্টি করতে পারলে বাঙালির সংগ্রাম নিয়ন্ত্রণে আনা যাবে, ফলস্বরূপ পাকিস্তান সেনাবাহিনী কর্তৃক জিয়া পুরস্কৃত হবেন - এটাই হয়তো জিয়ার সুপ্ত বাসনা ছিল। 

৮. মুক্তিযুদ্ধের নয় মাসে সম্মুখ সমরে অংশগ্রহণ না করে কামালপুরের যুদ্ধ, ওসমানীর সঙ্গে বৈরিতা সহ একের পর এক বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে যুক্ত হন জিয়া। এ কারণে যুদ্ধকালেই তাকে তিনবার বরখাস্ত এমন কি গ্রেফতার করার সিদ্ধান্তও নেয়া হয়েছিল যা তাজউদ্দিন আহমেদ ও খন্দকার মোশতাকের কারণে কার্যকর করা হয় নি।  

৯. স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধুর সরলতার সুযোগ নিয়ে জিয়া, মোশতাক গংয়ের আশীর্বাদে দেশের ক্ষমতাশালী গুটিকয়েক পদের একটি লাভ করেন। কিন্তু এখানেও তিনি দায়িত্ব পালনের পরিবর্তে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হন। একের পর এক পদোন্নতি পেয়েও নিয়োজিত থাকেন ষড়যন্ত্র ও অপপ্রচারের কুশীলব রূপে। অন্যদিকে বাকশালের সদস্যপদ লাভেও তৎপর থাকেন ষড়যন্ত্র আড়াল করতে। ১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ পর্যন্ত আমরা যে অস্থিতিশীলতা ও সীমাবদ্ধতা দেখি তার নেপথ্যে ছিল জিয়ার মতো চক্রান্তকারীরা যারা পাকিস্তান ভাঙার প্রতিশোধ ও ক্ষমতা দখল নিতে মরিয়া ছিলেন।

১০. জিয়া যে পাকিস্তানের এজেন্ট ছিল তা সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর। কলমের খোঁচায় অধ্যাদেশের পর অধ্যাদেশ জারি করে সংবিধানকে কলঙ্কিত করা, স্বাধীনতা বিরোধী ও বঙ্গবন্ধুর খুনিদের পুনর্বাসন, ছাত্র-যুবকদের হাতে অস্ত্র তুলে দেয়া, রাজনীতিকে ভ্রষ্টাচারে পরিণত করা সহ মুক্তিযুদ্ধের মৌলিক চেতনা পরিপন্থি সকল অপরাজনীতির সূচনা করেন জিয়াউর রহমান।

জিয়াকে মুক্তিযোদ্ধা বলা দূরের কথা পাকিস্তানের স্পাই ছাড়া দেশপ্রেমিক একজন নাগরিক হিসেবে গণ্য করার মতো একটি যুক্তিও কি কেউ দিতে পারবেন? 

দৈনিক জামালপুর
দৈনিক জামালপুর