• রোববার   ২৪ অক্টোবর ২০২১ ||

  • কার্তিক ৯ ১৪২৮

  • || ১৬ রবিউল আউয়াল ১৪৪৩

দৈনিক জামালপুর

কামালপুর যুদ্ধ- জিয়ার ব্যর্থতা! নাকি ইচ্ছাকৃত আত্মঘাতি সিদ্ধান্ত?

দৈনিক জামালপুর

প্রকাশিত: ৭ অক্টোবর ২০২১  

কামালপুর যুদ্ধ; আমাদের প্রথম সম্মুখ সমর। মহান মুক্তিযুদ্ধের প্রাথমিক পর্যায়ে সংঘটিত কামালপুর যুদ্ধ এক বেদনাময় ও অবিস্মরণীয় আত্নত্যাগের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। জিয়াউর রহমানের অপরিপক্ক সিদ্ধান্তের কারণে এ যাবতকালের সর্বোচ্চ সংখ্যক মুক্তিযোদ্ধা সেনাসদস্য শহীদ হন। জিয়ার আত্মঘাতি এবং/অথবা ইচ্ছাকৃত সিদ্ধান্তের কারণে এত ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে কিনা - ১৯৭১ সাল থেকেই এ প্রশ্ন উঠেছে।  

কামালপুর ঘাটি ছিল অবস্থানগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। স্থানটি জামালপুর, টাংগাইল ও ঢাকার সংযোগ সড়কের উপর অবস্থিত। পাকিস্তানি বাহিনীর ১৪ তম ডিভিশনের সৈন্যরা কামালপুরের প্রতিরক্ষায় নিয়োজিত ছিলেন। কামালপুর নিয়ন্ত্রণে আনতে জুনের ২৫ তারিখ থেকে শুরু হয় আমাদের যুদ্ধ প্রশিক্ষন। 

মুক্তিযুদ্ধের প্রথম পর্যায়ে মুক্তিবাহিনীর রসদ, অস্ত্র ও গোলাবারুদ সরবরাহের নিয়মিত কোন ব্যবস্থা ছিল না। যা ছিল তাও ছিল অপর্যাপ্ত। প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ও সরবরাহ পাওয়ার আগ পর্যন্ত হানাদারদের মোকাবিলায় গেরিলা পদ্ধতির আশ্রয় নেয়া হত। এর উদ্দেশ্য ছিল শত্রু বাহিনীর মনোবল ভেঙ্গে দেয়া। কিন্তু এ অবস্থাতেই জুলাই মাসের ৩য় সপ্তাহে মইনুল হোসেন চৌধুরীকে মেজর জিয়া ব্যাটালিয়ন পর্যায়ে সম্মুখ যুদ্ধ করে কামালপুর ঘাটি দখল করার কথা বলেন। কিন্তু মইনুল হোসেন যুদ্ধের পরিবর্তে পূর্বের মত হিট এন্ড রান পদ্ধতিতে আরও কিছুদিন চালিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে মত দেন। মইনের মতে, অধিক সজ্জিত পাকিস্তানি ব্যাটালিয়নের সাথে যুদ্ধে সমগ্র ব্যাটালিয়নের যুদ্ধ ক্ষমতা নষ্ট হয়ে যেতে পারে। 

কিন্তু মইনের পরামর্শ উপেক্ষা করে উচ্চ কমান্ডের নির্দেশ হিসেবে রেকি করা শুরু হয় যা পাকিস্তানি সেনাদের নজরে চলে আসে। মুক্তিযুদ্ধের নয় মাসে জিয়া কোনো সম্মুখ সমরে অংশগ্রহণ না করলেও নিজেদের সক্ষমতা ও রসদের কথা না ভেবে ৩১ জুলাই রাত সাড়ে তিন টায় আক্রমনের তারিখ ও সময় নির্ধারণ করেন। সতর্ক পাকিস্তানি বাহিনীর সৈন্য ও অস্ত্র ক্ষমতা বৃদ্ধির খবর জেনেছিল আমাদের মুক্তিযোদ্ধারা। উপরন্তু বৃষ্টির কারণে আক্রমনে বাধা থাকা সত্ত্বেও ৩১ জুলাই নির্ধারিত সময়ে ক্যাপ্টেন হাফিজ (বি কোম্পানি ) ও ক্যাপ্টেন সালাহউদ্দিন (ডেল্টা কোম্পানি ) এর নেতৃত্বে দুটি কোম্পানি শত্রুর ঘাটির দিকে অগ্রসর হওয়ার নির্দেশ দেয়া হয়। ক্যাপ্টেন মাহবুবের নেতৃত্ত্বে অপর কোম্পানি কে নির্দেশের জন্য অপেক্ষায় থাকতে বলা হয়। আক্রমনের আগে শত্রুপক্ষের উপর গারো পাহাড়ের কাছ থেকে হালকা কামানের গোলা বর্ষণ শুরু হয় সাথে সাথে পাক বাহিনীও পাল্টা কামানের গোলার মাধ্যমে জবাব দিতে শুরু করে।

বীরের মত যুদ্ধ করে সালাহউদ্দিন মমতাজ শহীদ হন। সহযোদ্ধাদের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয় এই যোদ্ধার লাশ আনতে গিয়ে যুদ্ধের মধ্যেই প্রথমে সিপাহি হায়াত আলী ও পরে সিপাহি সিরাজুল ইসলাম শহিদ হন। 

সীমাবদ্ধতা নিয়ে বীরের মত যুদ্ধ করেও কামালপুর ঘাটি দখল করা সম্ভব হয়নি। যেকোনো অধিকায়কের এটি জানার কথা ছিল যে তখন এমন একটি শক্তিশালী ঘাটির সঙ্গে সম্মুখ সমরের সময় ছিল না। এ কারণেই ডিসেম্বরের ৪ তারিখের আগে কামালপুর দখলে আসেনি! কিন্তু উচ্চ পর্যায়ের সিদ্ধান্তের বলি হন বাংলা মায়ের ৩৫ জন বীর যোদ্ধা শহিদ এবং ক্যাপ্টেন হাফিজ, লেফটেনেন্ট মান্নানসহ আরও ৬৭ জন।

কামালপুরের যুদ্ধে অপরিপক্ক কিংবা ইচ্ছাকৃত আত্মঘাতী সিদ্ধান্তের কারণে জিয়াকে দায়িত্ব থেকে অব্যহতি দিয়ে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেন ওসমানী।

জিয়া কি দক্ষ সমরনায়ক ছিলেন? তিনি যথাযথ সিদ্ধান্ত নিতে পারতেন? জিয়া নিজেই লিখেছেন

তিনি ১৯৬৫ সালে পাকিস্তানের খেমকারানে যুদ্ধ করে প্রশংসা অর্জন করেছিলেন। (জিয়াউর রহমান, বিচিত্রা ১৯৭৪)। 

প্রকৃতপক্ষে মুক্তিযুদ্ধের পূর্ববর্তী সময় থেকে মৃত্যুর দিন পর্যন্ত জিয়ার কোনো সিদ্ধান্তই বাংলাদেশে বা এর জনগণের পক্ষে ছিল না। মেজর রফিকুল ইসলামের মতে, জিয়া ভ্রান্তভাবে পরিকল্পিত একটি অভিযান করতে যেয়ে একদিনে ৬৭ যোদ্ধা হারিয়েছিলেন। শাফায়াত জামিলও এই যুদ্ধের কথা লিখেছেন। গোটা মুক্তিযুদ্ধের সময়ে অন্য কোন সেক্টরে অভিযান চালাতে যেয়ে এ রকম অপূরণীয় ক্ষতি আর কারো দ্বারা সংঘটিত হয় নি। 

দৈনিক জামালপুর
দৈনিক জামালপুর