• সোমবার   ৩০ জানুয়ারি ২০২৩ ||

  • মাঘ ১৭ ১৪২৯

  • || ০৭ রজব ১৪৪৪

দৈনিক জামালপুর

১ দিনে ১০০ সেতু, ১০০ মহাসড়ক: যোগাযোগে আরও একধাপ অগ্রগতি

দৈনিক জামালপুর

প্রকাশিত: ৫ জানুয়ারি ২০২৩  

এক-দুটি কিংবা দশ-বিশটি সেতু নয়। সংখ্যার হিসাবে একশ সেতু। নানান দৈর্ঘ্যের, নানান প্রস্থের। সেতুগুলো দেশজুড়ে বিভিন্ন জাতীয় ও আঞ্চলিক মহাসড়ক এবং জেলা সড়কে নির্মিত। এসব সেতু সমতল ভূমি, জলাশয়, খাল-বিল, নদনদী আর পাহাড়ের মায়ায় ঘেরা এই বদ্বীপ জনপদে তৈরি করেছে নিরবচ্ছিন্ন যোগাযোগের সেতুবন্ধ। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের অধীন সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর কর্তৃক নবনির্মিত একশ সেতু উদ্বোধনের জন্য প্রস্তুত। এসব সেতু যানবাহন চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করার মধ্য দিয়ে দেশের যোগাযোগব্যবস্থা এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হতে যাচ্ছে নতুন মাত্রা। সরকারের সাফল্যের মুকুটে যোগ হতে যাচ্ছে আরও একটি হিরণ্ময় পালক।

একসময় তলাবিহীন ঝুড়ির দেশ বলে অপবাদ সইতে হয়েছে স্বাধীন এ দেশকে। রক্তমূল্যে অর্জিত দেশকে বিদেশি মিডিয়া বিশ্বমাঝে পরিচয় করিয়েছিল বন্যা-সাইক্লোনে বিধ্বস্ত এক অভাবগ্রস্ত জনপদ হিসেবে। প্যারিস কনসোর্টিয়াম বৈঠকে বাংলাদেশের অর্থমন্ত্রীকে তীর্থের কাকের মতো অপেক্ষা করতে হতো সাহায্যের প্রতিশ্রুতির জন্য। সে প্রতিশ্রুতির ওপর ভিত্তি করে রচিত হতো দেশের বাজেট। কিন্তু এ দৃশ্যপট বদলে গেছে। চালচিত্রে এখন পরিবর্তনের হাওয়া। খাদ্য ঘাটতির দেশ আজ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ। অভাবগ্রস্ত বাংলাদেশ আজ অপার সম্ভাবনার মোহনা। অদম্যগতিতে ছুটে চলা বাংলাদেশ ইতোমধ্যে স্বীকৃতি পেয়েছে উন্নয়নের রোল মডেল হিসেবে। বিশ্ব অর্থনীতির মানচিত্রে বাংলাদেশ আজ প্রবৃদ্ধি ও সমৃদ্ধির এক নবতর সংস্করণ। বদলে গেছে দেশের সক্ষমতা। অন্যান্য খাতের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগিয়েছে সড়ক যোগাযোগব্যবস্থা। দেশের স্থল যোগাযোগ অবকাঠামো এখন উন্নয়নবান্ধব। ছন্দময় গতিময়তা সড়ক-মহাসড়কজুড়ে। নদনদীজনিত বিচ্ছিন্নতা জয় করে একের পর এক গড়ে উঠছে সেতু। প্রত্যন্ত কোনো একটি জনপদ এখন আর বিচ্ছিন্ন নয়। এসেছে সড়ক নেটওয়ার্কের আওতায়। হাওর এলাকা কিংবা পার্বত্য জনপদ; সর্বত্রই আজ সড়ক যোগাযোগের জয়জয়কার। সরকারের গতিশীল এবং পরিকল্পিত নেতৃত্বে যোগাযোগব্যবস্থা এখন উন্নয়নের নিত্য অনুঘটক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত।

অর্থনৈতিক উন্নয়নকে ত্বরান্বিত করতে একের পর এক নির্মিত হচ্ছে দুপাশে সার্ভিস লেনসহ চার লেনের মহাসড়ক। পর্যায়ক্রমে দেশের সব জাতীয় মহাসড়ক ছয় লেনে উন্নীত করার এক সাহসী পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। আর এ পরিকল্পনা বাস্তবায়নে অবিরাম কাজ করছে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়। একের পর এক নির্মিত হচ্ছে সেতু। তৈরি হচ্ছে বিচ্ছিন্ন জনপদের মাঝে স্বপ্ন ও সম্ভাবনার সেতুবন্ধ। নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ জানান দিয়েছে তার সাহস এবং অর্থনীতির সক্ষমতা। দেশব্যাপী যাত্রী ও পণ্য পরিবহন উপযোগী সড়ক অবকাঠামো তৈরি হয়েছে। এ অবকাঠামো আরও গতিশীল এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সঙ্গে তাল মিলিয়ে আধুনিক করা হচ্ছে। চার লেনের মহাসড়ক থেকে একধাপ এগিয়ে মাওয়া হতে পদ্মা সেতু হয়ে ফরিদপুরের ভাঙ্গা পর্যন্ত নির্মিত হয়েছে দেশের প্রথম এক্সপ্রেসওয়ে। মহাসড়কে ইন্টেলিজেন্ট ট্রান্সপোর্ট সিস্টেম বা আইটিএসসহ হালনাগাদ প্রযুক্তির ব্যবহার করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। চালু হয়েছে রোড সেফটি অডিট। রাজধানী শহরে বসবাসকারীদের স্বস্তি দিতে এ বছরের শেষ নাগাদ চালু হতে যাচ্ছে দেশের প্রথম এবং নতুন প্রজন্মের মেট্রোরেল। ২০৩০ সালের মধ্যে সময়বদ্ধ পরিকল্পনার আওতায় আসছে মেট্রোরেলের আরও চারটি রুট। কর্ণফুলী নদীর তলদেশ দিয়ে নির্মাণ করা হচ্ছে দেশের প্রথম বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কর্ণফুলী টানেল।

দেশব্যাপী সড়ক যোগাযোগে বৈপ্লবিক পরিবর্তন ইতোমধ্যে দৃশ্যমান হতে শুরু করেছে। এ ধারাবাহিকতায় সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ বিভিন্ন প্রকল্পের আওতায় নির্মাণকাজ শেষ করেছে একশটি ছোট-মাঝারি এবং বড় সেতুর কাজ। দেশব্যাপী বিভিন্ন প্রকল্পের আওতায় নির্মাণ করা হচ্ছে নতুন নতুন সড়ক এবং সেতু। চলছে এ নির্মাণ ও সৃজনের মহাযজ্ঞ। ২০৪১ সালের মধ্যে সমৃদ্ধ বাংলাদেশ নির্মাণের যে লক্ষ্য স্থির করা হয়েছে, নানান প্রতিবন্ধকতা মাড়িয়ে সে অভিলক্ষ্যে দুর্বার গতিতে এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ।

ভূপ্রকৃতির দিক দিয়ে বাংলাদেশ এক বৈচিত্র্যময় নিসর্গের আধার। বঙ্গোপসাগরের স্নেহধন্য নদীবিধৌত এ পললভূমিতে রয়েছে প্রাকৃতিক সম্পদের প্রাচুর্য। অসংখ্য নদনদী, হাওর, জলাশয় আর দুর্গম পাহাড়ি জনপদকে অভিন্ন ও নিরাপদ সড়ক নেটওয়ার্কের আওতায় আনা চ্যালেঞ্জিং কাজ। আর এ কাজটিই শুরু করেছেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তিনিই যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ পুনর্গঠনের উদ্যোগ গ্রহণ করেন। প্রথমেই মনোযোগী হন বিধ্বস্ত সড়ক নেটওয়ার্ক পুনঃপ্রতিষ্ঠায়। তার নেতৃত্বেই ১৯৭৪ সালের মধ্যে মুক্তিযুদ্ধের সময় ধ্বংসপ্রাপ্ত সব সেতু পুনর্নির্মাণের মাধ্যমে বিধ্বস্ত যোগাযোগব্যবস্থা সচল করা সম্ভব হয়। ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক-সেতু মেরামতের পাশাপাশি বঙ্গবন্ধুর সরকার প্রায় ৪৯০ কিলোমিটার নতুন সড়ক নির্মাণ করে। প্রথম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় একটি আধুনিক সড়ক নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার সুদূরপ্রসারী পথ দেখিয়েছিলেন তিনি। ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় তার সুযোগ্য কন্যা বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ১৯৯৬ থেকে ২০০১ এবং ২০০৯ থেকে এ পর্যন্ত দূরদর্শী পরিকল্পনা ও পদক্ষেপে বর্তমানে বাংলাদেশের সড়ক যোগাযোগে এসেছে বৈপ্লবিক পরিবর্তন। ২০০৯ থেকে সরকারের বর্তমান মেয়াদে সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর কর্তৃক দেশের বিভিন্ন সড়ক-মহাসড়ক উন্নয়নের পাশাপাশি ১ লাখ ১৩ হাজার মিটার সেতু নির্মাণ ও পুনর্নির্মাণ করা হয়েছে। কালভার্ট নির্মাণ ও পুনর্নির্মাণ করা হয়েছে প্রায় ২১ হাজার ৩০০ মিটার। এ সময়ে প্রায় ৭১৮ কিলোমিটার মহাসড়ক চার লেনে উন্নীত করা হয়েছে। দুপাশে সার্ভিস লেনসহ চার লেনে উন্নীতকরণ কাজ চলছে আরও প্রায় ৬৭৩ কিলোমিটার মহাসড়কের।

নিরবচ্ছিন্ন, সাশ্রয়ী, নিরাপদ ও টেকসই সড়ক যোগাযোগ প্রতিষ্ঠার ধারাবাহিকতায় শতসেতু উদ্বোধনের মাধ্যমে দেশের সড়ক যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়নে তৈরি হতে যাচ্ছে আরেক ইতিহাস। এই একশটি সেতু বাংলাদেশের ২৫টি জেলায় অবস্থিত যার সর্বমোট দৈর্ঘ্য ৫ হাজার ৪৯৪ মিটার। এর মধ্যে ঢাকা বিভাগে ৭, চট্টগ্রাম বিভাগে ৪৬, ময়মনসিংহ বিভাগে ৬, সিলেট বিভাগে ১৭, বরিশাল বিভাগে ১৪, রাজশাহী বিভাগে ৭ এবং রংপুর বিভাগে রয়েছে ৩টি সেতু। এর মাঝে সর্ববৃহৎ রানীগঞ্জ সেতুটি ৭০০ মিটার দীর্ঘ। এটি সুনামগঞ্জ জেলার রানীগঞ্জে কুশিয়ারা নদীর ওপর নির্মিত। এর ফলে সুনামগঞ্জ ও ঢাকার মধ্যে দূরত্ব কমেছে ৩৮ কিলোমিটার। এ ছাড়াও চট্টগ্রামে কর্ণফুলী থানায় গুরুত্বপূর্ণ বরকল-ওহিদিয়া সেতু এবং চানখালী নদীর ওপর নির্মিত কালারপোল সেতু দক্ষিণ চট্টগ্রামের সড়ক যোগাযোগকে করেছে অপার সম্ভাবনাময় এবং সময় সাশ্রয়ী। নবনির্মিত অধিকাংশ সেতুর সঙ্গে নির্মাণ করা হয়েছে সংযোগ সড়ক। সড়ক নিরাপত্তার বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে নিয়ে স্থাপন করা হয়েছে সাইন এবং সড়ক নিরাপত্তাবিষয়ক বিভিন্ন নির্দেশনা। সেতুগুলো সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের প্রকৌশলীদের ডিজাইনে এবং সরকারের নিজস্ব অর্থায়নে নির্মিত। ডিজাইন প্রণয়ন ও নির্মাণকালে শতবর্ষী বদ্বীপ পরিকল্পনার মূলনীতি অনুসরণে নদী বা খালের প্রবাহকে স্বাভাবিক রাখা, পরিবেশ, প্রতিবেশ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব বিবেচনায় আনা হয়েছে। এ ছাড়া প্রায় ৯ হাজার ১০০ মিটার দৈর্ঘ্যের ১১৮টি সেতু নির্মাণাধীন, যেগুলোর কাজ ২০২৩-২৪ এর মধ্যে শেষ হবে। এ ছাড়া দুর্গম পাহাড়ি জনপদের যোগাযোগ সহজতর করতে ১১৫টি স্টিল ব্রিজ পুনর্নির্মাণ প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে।

উদ্বোধনের জন্য প্রস্তুত নবনির্মিত একশটি সেতু বর্তমান সরকারের অব্যাহত সাফল্যের মুকুটে যোগ করেছে আরেকটি হিরণ্ময় পালক। এর ফলে সারা দেশের উপআঞ্চলিক সড়ক যোগাযোগ হয়ে উঠবে আরও শক্তিশালী। যাত্রী ও পণ্য পরিবহন দ্রুত, সহজতর ও নিরাপদ হয়ে উঠবে। শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে যাবে দুর্গম এলাকায়। খাদ্য নিরাপত্তা বৃদ্ধি পাবে, কর্মসংস্থান সৃষ্টির ফলে সামষ্টিক অর্থনীতি হবে গতিময়।

লেখক : উপসচিব, সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ

দৈনিক জামালপুর
দৈনিক জামালপুর