• বৃহস্পতিবার ১৮ জুলাই ২০২৪ ||

  • শ্রাবণ ৩ ১৪৩১

  • || ১০ মুহররম ১৪৪৬

নির্মাণকাজে অনিয়ম, দুদকে জিজ্ঞাসাবাদ ৬ কর্মকর্তাকে

দৈনিক জামালপুর

প্রকাশিত: ১৩ জুন ২০২৪  

নৌপরিবহন অধিদপ্তরের ১১ তলা ভবন নির্মাণে অনিয়ম-দুর্নীতি ও দীর্ঘসূত্রতার অভিযোগ তদন্ত করছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। রাজধানীর আগারগাঁওয়ে ভবনটির নির্মাণকাজে অনিয়মের বিষয়ে এরই মধ্যে প্রকল্পসংশ্লিষ্ট ছয় কর্মকর্তাকে ডেকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে দুদক। অভিযুক্ত অন্যদেরও জিজ্ঞাসাবাদের প্রক্রিয়া শুরু করেছে সংস্থাটি। ভবন নির্মাণে অনিয়মের অভিযোগ ওঠায় এ বিষয়ে তথ্য চেয়ে দুদক নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের সচিবকে এর আগে চিঠি দিয়েছিল। সংস্থাটির মহাপরিচালক রেজাওয়ানুর রহমান গত ৭ জানুয়ারি নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের সচিবের কাছে ভবন নির্মাণে দুর্নীতির তদন্তের বিষয়ে ওই চিঠি পাঠান। অভিযোগের বিষয়ে যথাযথ ব্যবস্থা নিয়ে দুদক মহাপরিচালককে (প্রশাসন) অবহিত করার অনুরোধও জানানো হয় চিঠিতে। দুদকের চিঠির প্রেক্ষিতে ১৭ জানুয়ারি নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের উন্নয়ন-৩ শাখার উপসচিব অনিয়ম-দুর্নীতির বিষয়ে মূল অভিযুক্ত এ প্রকল্পের পরিচালক ও নৌপরিবহন অধিদপ্তরের নটিক্যাল সার্ভেয়ার পরিচালক আবু সাঈদ মোহাম্মদ দেলোয়ার রহমানের বক্তব্য জানতে চেয়ে চিঠি দেন। ৭ ফেব্রুয়ারি দেলোয়ার লিখিত বক্তব্য জমা দিলে অধিদপ্তরের মহাপরিচালক কমডোর মোহাম্মদ মাকসুদ আলমের মাধ্যমে সেটি নৌ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। নৌ মন্ত্রণালয় থেকে এ জবাবের কপিসহ এ-সংক্রান্ত তথ্য দুদকে পাঠানো হলেও সংস্থার কর্মকর্তারা এতে সন্তুষ্ট হতে পারেননি। এ অবস্থায় দুদক নিজেরাই বিষয়টি তদন্তের উদ্যোগ নেয়। এরই অংশ হিসেবে সম্প্রতি ছয় কর্মকর্তাকে আনুষ্ঠানিক জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের অধীন নৌপরিবহন অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধানে এস্টাবলিশমেন্ট অব গ্লোবাল মেরিটাইম ডিস্ট্রেস অ্যান্ড সেফটি সিস্টেম অ্যান্ড ইন্টিগ্রেটেড মেরিটাইম নেভিগেশন সিস্টেম প্রকল্পের আওতায় ১১ তলা ভবনের নির্মাণকাজ চলছে। এরই মধ্যে সেখানে অধিদপ্তরের কার্যালয় স্থানান্তরিত হয়েছে। এটি নির্মাণে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ নিয়ে গত বছরের মে মাসে সমকালসহ বিভিন্ন পত্রিকায় রিপোর্ট প্রকাশ হয়। প্রকল্পসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দাবি, ভবনটি নির্মাণের কাজ ৯৫ ভাগ শেষ হয়েছে। প্রকল্পের নির্ধারিত সময় আগামী ৩০ জুনের মধ্যে এই কাজ শেষ করা হবে। তবে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক কর্মকর্তা বলছেন, অনুমোদিত নকশার বাইরে নানা ত্রুটিবিচ্যুতি নিয়ে নির্মাণ হচ্ছে ভবনটি। অনিয়ম ধামাচাপা দিতে তড়িঘড়ি করে নির্মাণকাজ শেষ করা হচ্ছে। তবে কোনো অবস্থায়ই ৭০-৭৫ শতাংশের বেশি কাজ শেষ হয়েছে বলা যাবে না। সমুদ্র ও উপকূলীয় অঞ্চলে নিরাপদ নৌ চলাচল নিশ্চিত করতে ২০১৪ সালে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের অধীনে গ্লোবাল মেরিটাইম ডিস্ট্রেস অ্যান্ড সেফটি সিস্টেম (জিএমডিএসএস) প্রকল্প নেওয়া হয়। বাস্তবায়নের দায়িত্ব দেওয়া হয় নৌপরিবহন অধিদপ্তরকে। প্রকল্পের মোট ৩৮২ কোটি টাকার মধ্যে দক্ষিণ কোরিয়ার ঋণ সহায়তা ৭০ শতাংশ ও বাকি ৩০ শতাংশ বাংলাদেশ সরকারের। তিন বছর মেয়াদি এ প্রকল্প বাস্তবায়নের শেষ সময় ছিল ২০১৬ সালের ৩১ ডিসেম্বর। পরে দুই দফায় প্রকল্পটির কাজের পরিধি বাড়িয়ে এর নামকরণ করা হয় এস্টাবলিশমেন্ট অব গ্লোবাল মেরিটাইম ডিস্ট্রেস অ্যান্ড সেফটি সিস্টেম অ্যান্ড ইন্টিগ্রেটেড মেরিটাইম নেভিগেশন সিস্টেম। ব্যয় বরাদ্দ বাড়িয়ে করা হয় ৭৭৯ কোটি টাকা। বাস্তবায়নের সময়সীমা ২০২৪ সালের ৩০ জুন চূড়ান্ত করা হয়। এ প্রকল্পের আওতায় ১১ তলা ভবন নির্মাণ করা হচ্ছে। অন্যান্য স্থাপনার মতোই এই ভবনটির নির্মাণ শেষ করার কথা ছিল ২০১৬ সালের ৩১ ডিসেম্বর। পরে সময় বাড়িয়ে করা হয় ২০১৭ সালের ২৯ ডিসেম্বর থেকে ২০২১ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত। কিন্তু নির্মাণকাজ শেষ না হওয়ায় পুরো প্রকল্পের পাশাপাশি ভবনটি নির্মাণের সময়সীমা বাড়িয়ে ২০২৪ সালের ৩০ জুন করা হয়। সূত্র জানায়, ভবনটির নিচতলা থেকে অষ্টম তলা পর্যন্ত নির্মাণ ব্যয় ধরা হয়েছে ৪০ কোটি টাকা; যা দক্ষিণ কোরিয়া সরকার দেশটির এক্সিম ব্যাংকের মাধ্যমে দেবে। পরবর্তী সময়ে আরও তিন তলা সম্প্রসারণ করে নবম থেকে ১১ তলা পর্যন্ত নির্মাণ ব্যয় ধরা হয়েছে ১০ কোটি টাকা, যা দেওয়া হচ্ছে বাংলাদেশ সরকারের নিজস্ব তহবিল থেকে। এ প্রকল্পের মূল ঠিকাদার কোরীয় কোম্পানি এলজি সামিহ। তবে কোরীয় ঠিকাদার এই কাজে বাগদাদ কনস্ট্রাকশনসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানকে সহঠিকাদার নিয়োগ করেছে। তারাই ভবন নির্মাণসহ ডেকোরেশনের কাজ করছে। প্রকল্প পরিচালক দেলোয়ার রহমানসহ কোরীয় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে নিম্নমানের সরঞ্জাম ব্যবহার ও নকশাবহির্ভূত কাজ করতে গিয়ে জালিয়াতির আশ্রয় গ্রহণসহ দুর্নীতির নানা অভিযোগ উঠেছে। এ ছাড়া নৌপরিবহন অধিদপ্তরের তৎকালীন মহাপরিচালক কমডোর নিজামুল হকের বিরুদ্ধে সরকারি অর্থের অপচয় এবং বিল পরিশোধের জন্য কোরীয় প্রতিষ্ঠানকে চাপ দেওয়ার অভিযোগ ওঠে। এসব নিয়ে নিজামুল হকের সঙ্গে দেলোয়ার রহমানের বিরোধ চরমে ওঠে। এক পর্যায়ে নিজামুল হক প্রকল্প পরিচালককে প্রত্যাহার ও নতুন পরিচালক নিয়োগের অনুরোধ জানিয়ে মন্ত্রণালয়ে চিঠি দেন। সে সময় মন্ত্রণালয় বিষয়টি নিয়ে তদন্ত করে। পরে কমডোর নিজামুল হক নৌবাহিনীতে ফিরে যান। তবে দেলোয়ারসহ অভিযুক্তদের রক্ষায় প্রভাবশালীরা অপচেষ্টা চালাচ্ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। এ বিষয়ে দেলোয়ার রহমান বলেন, ভবন নির্মাণসহ প্রকল্পটি বাস্তবায়নে অনিয়ম হয়নি। দরপত্রের শর্ত এবং এ-সংক্রান্ত সরকারি বিধিবিধান মেনেই সবকিছু করা হচ্ছে। তিনি বলেন, ‘এক বছর আগেই এ নিয়ে মন্ত্রণালয়ের তদন্তে অভিযোগ প্রমাণ হওয়ায় অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে আমার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের নিষ্পত্তি হওয়ার পর স্বেচ্ছায় প্রকল্প পরিচালকের পদ থেকে পদত্যাগ করেছিলাম। মন্ত্রণালয় পদত্যাগপত্র গ্রহণ না করলে আমার কী করার আছে?’ নদী গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাবেক মহাপরিচালক প্রকৌশলী ম. ইনামুল হক বলেন, যে কোনো দুর্নীতির অভিযোগ উঠলেই সরকারের উচিত দ্রুত তদন্ত করে ব্যবস্থা গ্রহণ করা। বিলম্ব বা গাফিলতি হলে অপরাধীরা পার পেয়ে যায়, দুর্নীতি বাড়তে থাকে।

দৈনিক জামালপুর
দৈনিক জামালপুর