• বুধবার ১৭ জুলাই ২০২৪ ||

  • শ্রাবণ ২ ১৪৩১

  • || ০৯ মুহররম ১৪৪৬

বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতের উন্নয়নে চীনের অবদান

দৈনিক জামালপুর

প্রকাশিত: ৮ জুলাই ২০২৪  

বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতের উন্নয়নে চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (বিআরআই) এর অবদান উল্লেখ্যযোগ্য। চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের (বিআরআই) সহযোগিতায় বাংলাদেশের পায়রা বিদ্যুৎ কেন্দ্র বাস্তবায়নের ফলে সেখানকার স্থানীয় প্রায় ৮ হাজার ৪০০ বাসিন্দাদের চাকরির ব্যবস্থা করেছে। 

এছাড়া প্রায় ৬ হাজার ৩০০টি বৃত্তিমূলক দক্ষতা প্রশিক্ষণের সুযোগ প্রদান করেছে।
বাংলাদেশের এ বিদ্যুৎ কেন্দ্রটিতে ৬শ ৬০ মেগাওয়াট এর মোট ২টি ইউনিট নির্মাণ করা হয়, যার ফলে বিদ্যুৎ কেন্দ্রটির মোট উৎপাদন ক্ষমতা ১৩২০ মেগাওয়াট। এই কেন্দ্রে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য প্রতিদিন ১২ হাজার টনের বেশি কয়লা পোড়ানো হয়। ২০২৩ এর মে মাস পর্যন্ত প্রতিদিন এই কেন্দ্রে ১ হাজার থেকে ১২শ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হয়। এই প্রকল্পের মাধ্যমে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উৎপাদনে আল্ট্রা সুপারক্রিটিক্যাল প্রযুক্তি ব্যবহার করে বিশ্বের ১৩তম দেশে পরিণত হয়েছে।

এর আগে, কয়লা, অপর্যাপ্ত বিদ্যুতের অবকাঠামো এবং দ্রুত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির দ্বারা চালিত দ্রুত ক্রমবর্ধমান বিদ্যুতের চাহিদার মতো খনিজ সম্পদের অভাবের কারণে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ সরবরাহের ব্যবধানের মুখোমুখি হয়েছিল। যে কারণে অনেক গ্রাহকই নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ পাননি বা অতি মাত্রায় বিদ্যুৎ বিভ্রাটের সম্মুখীন হতে হয়েছে।

এই পটভূমিতে ২০১৬ সালে বাংলাদেশ ও চীনের যৌথ উদ্যোগে পায়রা তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র তৈরি হয়েছে। চায়না ন্যাশনাল মেশিনারি ইমপোর্ট অ্যান্ড এক্সপোর্ট কর্পোরেশন এবং বাংলাদেশের নর্থ-ওয়েস্ট পাওয়ার জেনারেশন কোম্পানির যৌথ বিনিয়োগ, নির্মাণ এবং পরিচালনায় এ প্রকল্পটি ২০২২ সালে সম্পন্ন হয়েছিল।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন,  প্রতিটি ঘরে বিদ্যুতের আলো জ্বালাতে পারলাম, এটাই হচ্ছে সব থেকে বড় কথা। আমরা আলোকিত করেছি এই দেশের মানুষের প্রত্যেকটা ঘর।

পায়রা বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি বাংলাদেশের বিদ্যুৎ সরবরাহের ‘ব্যালাস্ট স্টোন’-এর সমতুল্য। বাংলাদেশ-চায়না পাওয়ার কোম্পানি লিমিটেডের সাইটের চীনা কারিগরি ব্যবস্থাপক ওয়াং জিয়াংঝি বলেছেন, এই প্ল্যান্টটি বাংলাদেশকে ৮.৫৮ বিলিয়ন কিলোওয়াট ঘন্টা সরবরাহ করতে পারে। যা দেশের বার্ষিক স্থিতিশীল এবং নির্ভরযোগ্য বিদ্যুতের মোট চাহিদার প্রায় ১০ শতাংশ এবং দক্ষিণ-পশ্চিম গ্রিডের চাহিদার ২৫ শতাংশ।

বাংলাদেশি প্রকৌশলী ইনজামাম উল হক বলেন,পাওয়ার প্ল্যান্টটি শুরু থেকে এখন পর্যন্ত আমরা চীনা সহকর্মীদের কাছ থেকে অনেক কিছু শিখেছি। সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ডিগ্রি অর্জণ করেও নিজ দেশে আশানুরূপ চাকরি খুঁজে পায়নি। কিন্তু এই পাওয়ার প্লান্ট আমাদের নিজ দেশে সংশ্লিষ্ট চাকরি পেতে সাহায্য করেছে।

ইনজামাম উল হক আরো বলেন, চীনের সহায়তায় বাংলাদেশের অন্যান্য অংশে এই ধরনের অনেক প্ল্যান্ট নির্মাণাধীন রয়েছে। বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের অংশ হিসেবে, এই সহযোগিতা আমাদের বিদ্যুৎ খাতে উল্লেখযোগ্যভাবে উপকৃত হচ্ছে।

এরইমধ্যে  বাংলাদেশের ময়মনসিংহ জেলার একটি সমতল ভূমিতে, প্রায় ১ লাখ ৬৯ হাজার সৌর প্যানেল সারিবদ্ধভাবে স্থাপন করা হয়েছে, যা সূর্যের আলোকে বৈদ্যুতিক শক্তিতে রূপান্তরিত করছে। ৫০ মেগাওয়াট ফোটোভোলটাইক পাওয়ার প্ল্যান্টটি বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান সবুজ বিদ্যুৎ শক্তির উন্নয়নের একটি প্রতীক হয়ে উঠেছে। ফোটোভোলটাইক পাওয়ার প্ল্যান্টটি প্রধান শেয়ারহোল্ডার হল চায়না হুয়াডিয়ান ওভারসিজ ইনভেস্টমেন্ট কোং লিমিটেড। সৌর সম্পদের সুবিধা ব্যবহার করার জন্য এইচডিএফসি সিনপাওয়ার লিমিটেড দ্বারা বিনিয়োগকৃত প্রকল্পটি ২০১৯ সালে  নির্মাণ শুরু করে। এক বছরেরও বেশি সময় ধরে কঠোর নির্মাণ কাজের পর, ২০২০ সালের শেষের দিকে চীনের প্রায় ১৭০, ০০০ সৌর প্যানেল এলাকাটিতে বসানো করা হয়েছে। 

বাংলাদেশের প্রথম ফটোভোলটাইক পাওয়ার স্টেশন হিসেবে, এই প্রকল্পটি দেশে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের দ্বার উন্মুক্ত করেছে। সৌরশক্তিকে বিদ্যুতে রূপান্তরিত করে হাজার হাজার পরিবারকে আলোকিত করেছে। প্রকল্পটি বাংলাদেশকে বছরে ৫০ হাজার টন কার্বন নিঃসরণ কমাতে সাহায্য করে।

স্থানীয় গ্রামবাসী মোঃ ফজলুল হক চীনের গণমাধ্যমকে বলেন, এখন সূর্যের আলো থেকে বিদ্যুৎ তৈরি করা হচ্ছে। আমাদের অনেক ছেলে-মেয়ে, আত্মীয়স্বজন এই বিদ্যুৎ কেন্দ্রে কাজ করছে, এতে আমাদের অনেক উপকৃত হয়েছে। এতে এলাকার বাসিন্দারা খুবই খুশি।

আগে আমাদের এলাকায় বিদ্যুতের ব্যবস্থা না থাকার কারণে অনেক বাসিন্দারা অন্যত্র চলে যেত। কিন্তু এখন বিদ্যুতের সহজলভ্যতার কারণে অনেকেই বাড়ি তৈরি করে স্থায়ীভাবে থাকার পরিকল্পনা করছে।

শুধু ফোটোভোলটাইক শক্তি নয়। বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্ব উপকূলীয় শহর কক্সবাজারে দেশের প্রথম কেন্দ্রীভূত বায়ু বিদ্যুৎ প্রকল্পের 22টি বায়ু টারবাইন। প্রকল্পটির নেতৃত্বে রয়েছে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ইউএস-ডিকে গ্রিন এনার্জি বিডি লিমিটেড, আর্থিক সহায়তা দিচ্ছে চীনা কোম্পানি এসপিআইসি উলিং পাওয়ার কর্পোরেশন।

২০২২ সালের মার্চে ১১৬.৫১ মিলিয়ন ডলার ব্যয়ের এ প্রকল্পের কাজ শুরু হয়। প্রকল্পটি পুরোদমে চালু হওয়ার পর বিদ্যুৎকেন্দ্রটি বাংলাদেশকে প্রতি বছর প্রায় ১৪৫ মিলিয়ন কিলোওয়াট ঘণ্টা পরিচ্ছন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ করবে। কয়লার ব্যবহার ৪৪ হাজার টন এবং কার্বন-ডাই-অক্সাইড নিঃসরণ ১ লাখ ৮ হাজার ৩০০ টন কমাবে এ প্রকল্প। সেইসঙ্গে ১ লাখ পরিবারের বিদ্যুতের চাহিদা মেটাবে।

প্রকল্প পরিচালক এবং প্রকল্পটি বাস্তবায়নকারী চীনা কোম্পানির প্রতিনিধি প্রকৌশলী মুকিত আলম খান বলেন, 'বায়ুবিদ্যুৎকেন্দ্র প্রকল্পে অত্যাধুনিক চীনা প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে, যা প্রতি সেকেন্ডে ৫.২ মিটার পর্যন্ত বাতাসের গতি সহজেই পরিচালনা করতে সক্ষম।

প্রকল্প চলাকালীন উলিং পাওয়ার কর্পোরেশনের বাংলাদেশ বিভাগের মহাব্যবস্থাপক হেই ঝাও বলেন, এই প্রথম কোনো চীনা কোম্পানি, একজন বিনিয়োগকারী হিসেবে বাংলাদেশে বায়ুশক্তি চালু করেছে, যা দেশের পরিচ্ছন্ন জ্বালানি উন্নয়নে একটি মাইলফলক হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।

হেই ঝাও আরো বলেন, এটি শুধুমাত্র স্থানীয় স্বীকৃতিই অর্জন করেনি বরং বাংলাদেশের প্রথম ব্যাচের বায়ু শক্তি ক্ষেত্রের অপারেশন প্রতিভাকেও প্রশিক্ষিত করেছে। বিদ্যুত, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রকের অধীন পাওয়ার বিভাগ প্রায়শই বিশেষজ্ঞদের এই প্রকল্পটি পরিদর্শন ও অধ্যয়নের জন্য সংগঠিত করে।

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বাংলাদেশ ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’-এ যোগদানের পর থেকে চীন বাংলাদেশে ২৭টি বিদ্যুৎ শক্তি প্রকল্প নির্মাণ করেছে। এখন পর্যন্ত, বাংলাদেশে চীনা কোম্পানিগুলোর দ্বারা অংশগ্রহণ করা পাওয়ার স্টেশনগুলোর ক্ষমতা ৯ হাজার ৩৮ মেগাওয়াট ছাড়িয়ে গেছে যা বাংলাদেশের মোট স্থাপিত ক্ষমতার প্রায় ৩৫ শতাংশ, যা বাংলাদেশের দ্রুত অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নের জন্য একটি স্থিতিশীল বিদ্যুৎ সরবরাহের গ্যারান্টি প্রদান করে।

প্রসঙ্গত, বিআরআই হচ্ছে ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’-এর সংক্ষিপ্ত রূপ। এটি চীনের একটি উদ্যোগ; যা এশিয়া, ইউরোপ এবং আফ্রিকার মধ্যে সহযোগিতা ও সংযোগ ঘনিষ্ঠ করেছে। এটি এমন একটি ধারণা, যেখানে অসংখ্য বড় ও ক্ষুদ্র প্রকল্পের সমন্বিত চিন্তাভাবনা সামনে চলে আসে। এর অনেকগুলো ইতোমধ্যে বাস্তবায়িত বা বাস্তবায়নের বিভিন্ন পর্যায়ে আছে। আরো অসংখ্য নতুন প্রকল্প আগামীতে গ্রহণ করা হবে। এই ধারণাটি চীনের জন্য নতুন বা বিশেষ কিছু নয়। তাদের ভবিষ্যতের ভাবনা ও দৃশ্যকল্পের ধারাবাহিকতার সঙ্গে সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে মিলে যায়। 

দৈনিক জামালপুর
দৈনিক জামালপুর